এখন পড়ছেন
হোম > অন্যান্য > হীরানি চিত্রিত সঞ্জুর আত্মকথা, চোনা-সহ

হীরানি চিত্রিত সঞ্জুর আত্মকথা, চোনা-সহ



সঞ্জয় দত্ত অবোধ বালক ছিলেন। তাঁর সরল মন আর শিশুর মস্তিষ্ক। দুষ্টু বন্ধুর পাল্লায় পরে ড্রাগ নিয়েছেন, প্রেমে দাগা খেয়েছেন বলে আরও দুশো মেয়েকে শুইয়েছেন, বোর্ডিং স্কুলে যেতে হয়েছিল বলে বেহিসেবি-বাঁদর তৈরি হয়েছেন, মা বাবার চোখের মণি বলে উচ্ছন্নে যাওয়া লম্পট হয়েছেন। এর একটাও সঞ্জয় দত্ত নিজের দোষে হন নি। হয় বন্ধুদোষে বা ভাগ্যদোষে বা সঙ্গদোষে হয়েছেন।

এবার থেকে প্রিয় বন্ধুর খবর পড়া আরো সহজ, আমাদের সব খবর সারাদিন হাতের মুঠোয় পেতে যোগ দিন আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রূপে – ক্লিক করুন এই লিঙ্কে

অন্তত, রাজকুমার হিরানী পরিচালিত ‘সঞ্জু’ সিনেমায় এমন ছবিই দেখেছেন আমজনতা। আসলে ‘সঞ্জু’ চলচ্চিত্র কোনও নায়কের আত্মজীবনী নয় – ভারতের শ্রেষ্ঠ পরিচালকের হাতে তৈরি এক খলনায়কের ইমেজ মেকওভারের গল্প বলে ইতিমধ্যেই গুঞ্জন উঠে গেছে ফিল্ম সমালোচকদের মধ্যে। এমনকি কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন এই ‘মেকওভার’ হয়েছে প্রয়োজনে সত্যের বিকৃতি ঘটিয়েও!

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? কেন হঠাৎ সুনীল-নন্দনের ইমেজ ধোয়া-মোছার চেষ্টা হচ্ছে? সঞ্জয় কি রাজনীতিতে আসছেন? সিনেমা হিসাবে ‘সঞ্জু’ অসাধারণ। রনবীরের দারুণ অভিনয়, মন ছুঁয়ে যাওয়া কিছু দৃশ্য, চটুল কমিক সিন – কিন্তু কোথাও গিয়ে যেন বারবার এটাই বলার চেষ্টা – সঞ্জয় দত্ত নিজের দোষে কিছু হন নি। খারাপ হয়েছেন হয় বন্ধুদোষে বা ভাগ্যদোষে নয়তো সঙ্গদোষে। আর মিডিয়া এসব জেনেও তাকে নিয়ে উদ্বাহু নৃত্য করেনি।

১৬ জানুয়ারি ১৯৯৩ সঞ্জয় দত্ত যদি একবারও তাঁর প্রভাবশালী সাংসদ-বাবা বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বলতেন যে বাড়িতে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় একে ৫৭ আর বিপুল কার্তুজ রাখা আছে যা সেসময় ভাবাও যেত না কেউ ভারতে ব্যবহার করছে, তাহলে মুম্বাই সন্ত্রাসহানার ইতিহাসটাই অন্য হতে পারত বলে অনেকের ধারণা। হয়ত অনেকগুলো প্রাণ বাঁচত – হয়ত পাকিস্তানও মুম্বাইকে কেন্দ্র করে তাদের পরবর্তী ছকগুলো কষতে দুবার ভাবত।

সঞ্জয় দত্ত ৯৩’ মুম্বাই বিস্ফোরণে ব্যবহার হওয়া ৭১টি কালাশনিকভ, ৯০০টি কার্তুজ, ৫০০টি গ্রেনেড আর ৪টন আরডিএক্স থেকে ৩টি একে রাইফেল ও ২৫০টি কার্তুজ নিজের কাছে রেখেছিলেন। সন্ত্রাসবাদীদের বয়ান অনুসারে ‘নিরাপদ আস্তানায়’। সঞ্জু এই সব অস্ত্র নিজে হাতে নিয়েছিলেন আবু সালেমের থেকে। যে ভ্যানে করে সুনীল দত্তের বাড়িতে সেদিন অস্ত্র এসেছিল, সেই ভ্যানটিও মুম্বাই বিস্ফোরণে ব্যবহার করা হয় বলে বিভিন্ন লেখা থেকে জানা গেছে।

এক ফিল্ম সমালোচক তো নিজের লেখায় জানিয়েছেন – এটা সেই সময়ের কথা যখন মুম্বাই পুলিশ স্টেনগান আর রাইফেলে আটকে। এটা সেই সময়ের কথা যখন আরডিএক্স কি ভারতে কেউ সেরকম জানে না। কিন্তু এটা জানে ওই বিপুল অস্ত্রের সবটা যদি মুম্বাইয়ে ব্যবহার হত, তাহলে সমুদ্রপারে ধুলো বাদে আর কিছু অবশিষ্ট থাকত না। আমরাও কি জানি না? ১০টা কালাশনিকভ হাতে ২৬/১১ এর রাতে কি কি করা গিয়েছিল?

হিরানীর সঞ্জু মায়ের অসুস্থতার দুঃখ ভুলতে আর বাবার প্রতি অভিমানে মাদকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু অনেকের দাবি – আসল সত্যিটা তা নয়। ছোটবেলা থেকেই সঞ্জয় দত্ত ছিলেন খামখেয়ালী রাজপুত্র। কলেজ জীবন থেকেই মাদকের সঙ্গে তাঁর বসবাস, বন্ধুদের মাধ্যমে নেশার জগতের সঙ্গে পরিচয় – সেখানে অভিমান বা কষ্টের কোন ঘটনা ছিল না।

বেআইনি অস্ত্র রাখা নিয়েও লুকোচুরি খেলেছেন রাজকুমার হিরানী বলে অভিযোগ। সিনেমায় দেখিয়েছেন, বাবার ওপর প্রাণনাশের হুমকি আসায় নিজের পরিবারকে রক্ষা করার জন্যেই একে-৫৬ রাইফেল নিজের কাছে রেখেছিলেন সঞ্জয় দত্ত। কিন্তু এই দেখেই প্রশ্ন উঠছে, রাইফেলটা দাউদ ইব্রাহিমের সহযোগী আবু সালেমের থেকে কেন নিতে হলো সঞ্জয়কে? স্বাভাবিক উপায়ে একটা লাইসেন্স করা বন্দুক কি তিনি ঘরে রাখতে পারতেন না? একজন দাগী আসামী, তোলাবাজ মাফিয়ার থেকে অস্ত্র নিতে হল কেন? এক টক-শোয়ে আবার সঞ্জুবাবা স্বয়ং জানিয়েছিলেন, শিকারের ভীষণ শখ ছিল তাঁর। সেই জন্যেই নাকি ওই বন্দুক রেখেছিলেন নিজের কাছে। একে-৫৬ দিয়ে শিকারের এই গালগপ্পো শুনলে জিম করবেটও বোধহয় আত্মহত্যা করতেন!

আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়াদের সঙ্গে সঞ্জয় দত্তের সংযোগ নতুন নয়। দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ ছিল, দাউদের বিশ্বস্ত সহকর্মী ছোটা শাকিল, ছোটা রাজন, টাইগার মেমন, ইয়াকুব মেমনদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ হত সঞ্জয়ের। মুম্বাই বিস্ফোরণের পরে ছোটা শাকিলের সঙ্গে সঞ্জয়ের বেশ কয়েকটা ফোন রেকর্ডও ফাঁস করেছিল তৎকালীন মুম্বাই পুলিশ।

অথচ সিনেমায় দেখানো হয়েছে ভানুদাদা নামের এক কমিক ভিলেনকে, যিনি সঞ্জয়কে চাপাচাপি করেন কোন এক গণপতি বিসর্জনের অনুষ্ঠানে! ফলে প্রশ্ন উঠছে সিনেমায় ফিকশন অবশ্যই থাকবে কিন্ত তাই বলে সত্যকে আড়াল করে? আসলে এটাই হিরানী ভুলে গিয়েছিলেন, অথবা ভুলে যেতে চেয়েছিলেন। উল্টো মিডিয়াকে ভিলেন বানানো হয়েছে সিনেমায়। যেন সঞ্জয়কে পাঁচ বছরের সাজা মিডিয়া ট্রায়ালেই দেয়া হয়েছিল! আর তা নিয়েও তুমুল সমালোচনা শুরু হয়েছে।

সঞ্জয় দত্ত টাডাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পরে নিম্ন আদালত তাঁকে খালাশ করে দেয়। ভালো কথা – কিন্তু তারপরেই বিভিন্ন জায়গায় প্রশ্ন উঠতে শুরু হয়েছে সিবিআই কোন কারনে আর উচ্চ আদালতে আপিল করল না? আরও লক্ষ্যনীয়, মিডিয়াও কিন্তু সেসময় এই নিয়ে লাফালাফি করে নি। সঞ্জয় দত্ত বাদে অন্য কোন সন্ত্রাস হানায় পরোক্ষ অভিযুক্তকে দেখেছেন এতটা দয়া পেতে? ফলে এইসব বিতর্কিত দিক নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে।

অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা থেকে ছাড় পাননি সঞ্জয় দত্তের বাবা সুনীল দত্ত। তাঁর বিরুদ্ধে সবথেকে বড় অভিযোগ – সুনীল দত্ত ছেলের স্নেহে অন্ধ ছিলেন। ছেলে সঞ্জয়ের মুক্তির জন্য ক্ষমতার সমস্ত দরজা খটখটিয়েছিলেন নাকি তিনি। তা সে নরসিংহ রাও হোক, বাজপেয়ী হোক বা বালাসাহেব ঠাকরে। এমনকি সেই সময় – গোটা বলিউড পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। প্ল্যাকার্ড হাতে সলমান খানকে দেখা গিয়েছিল, ‘উই আর উইথ সঞ্জু’। আর তারপরেও জিজ্ঞাস্য থেকেছে – এতগুলো প্যারোল কি ভাবে পায় লোকে? কিভাবে সাজা মুকুব হয়?

একই সঙ্গে মুম্বাইয়ের ফিল্মি পাড়ায় কান পাতলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে – সিনেমায় সঞ্জু বাবা কিভাবে মাধুরীর গলায় সাপ ঝুলিয়ে তাঁকে প্রপোজ করেছিলেন আর ভয়ে কাঠ মাধুরী ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলেন, তা নেই কেন? এমনকি উঠেছে বিস্ফোরক অভিযোগ – সঞ্জুবাবা বলিউডের পরের প্রজন্মকে কিভাবে কোকেন বা স্টেরোয়েডের সঙ্গে আলাপ করিয়েছিলেন তাও নাকি নেই! যেরকম আরো অনেক রসালো, মুচমুচে অধ্যায় নেই। রিচা নেই, আগের পক্ষের মেয়ে নেই, সঞ্জয় গুপ্তে নেই, সলমান নেই, রউফ লালা নেই। রাখা হয়নি কেন? অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলে? বিতর্ক মাথা চাড়া দেবে বলে? প্রশ্নগুলি কিন্তু করতে ছাড়ছেন না বহু নামিদামি ফিল্ম সমালোচকই।

অন্যদিকে শপিং মলের বার্গার পার্টিতে বা মাল্টিপ্লেক্সের পপকর্ন চিবাতে চিবাতে আমজনতার উক্তি – হু হু বাওয়া! ভারতে বসে আত্মকথা ফিল্মবন্দী করা এত সহজ? একি হলিউড নাকি হে, যে গোটা জীবনটা, তার কেচ্ছা সমেত, হতাশাটুকু পুরো স্ক্যান করে চিত্রনাট্যে লেপ্টে দেওয়া যাবে? সঞ্জু অবোধ বালক ছিলেন – সরল মন আর শিশুর মস্তিষ্ক। নিজের দোষে খলনায়ক হন নি – হয় বন্ধুদোষে বা ভাগ্যদোষে বা সঙ্গদোষে। এই নিয়ে যদি কথা হয় হোক – কুছ তো লোগ কহেঙ্গে! ব্লাস্ট মে কুছ আদমি তো মরেঙ্গে! ছোড়ো বেকার ইন বাতো কো!

আপনার মতামত জানান -

Top
error: Content is protected !!