এখন পড়ছেন
হোম > বিশেষ খবর > পঞ্চায়েতে তুমুল সাফল্যের পরেও দুশ্চিন্তায় ভরা একরাশ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শাসকদলের অন্দরে

পঞ্চায়েতে তুমুল সাফল্যের পরেও দুশ্চিন্তায় ভরা একরাশ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শাসকদলের অন্দরে



পঞ্চায়েতের ফল বেরোতেই খুশিতে ফেটে পড়ছেন ঘাসফুল শিবিরের সমর্থকরা – শিলিগুড়ি থেকে দীঘা, সর্বত্র। একে র্যায়ের ৩৪% আসনে বিরোধীরা প্রার্থী দিতে না পাড়ায় নির্বাচনের আগেই জয়, আর তারপরে ব্যালট বাক্স খুলতেই দেখা গেছে সেখানেও শুধুই ঘাসফুলের রমরমা। এর মাঝেই দু-একটি জেলায় পদ্ম কিছুটা মাথা তুললেও, দলনেত্রী জানিয়ে দিয়েছেন সেখানে বাইরের রাজ্য থেকে লোক ঢুকিয়ে এবং টাকা ছড়িয়ে গেরুয়া শিবির জিতেছে, ফলে দুশ্চিন্তা নেই। আর তাই কোন নেতার হাত ধরে কতটা সাফল্য এল সেই হিসেব দেখতে ব্যস্ত এখন দলের বড়-মেজো-সেজো-ন-ছোট – সব নেতারাই। কিন্তু এত আনন্দের মাঝেও একরাশ দুশ্চিন্তা বাড়ানো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শাসকশিবিরের অন্দরেই। সামনে আসছেন না বা নাম প্রকাশও করতে চাইছেন না, কিন্তু দলের বিক্ষুব্ধ ও আদি অংশের সঙ্গে কথা বললেই সামনে এসে পড়ছে সেই প্রশ্নমালা। কি সেই প্রশ্ন একনজরে দেখে নেওয়া যাক –

১. জেলা পরিষদের আসনের একটা বড় অংশে এবার নির্বাচন হয় নি, রাজ্যের রাজনৈতিক ‘আবহাওয়া’ বোঝা যায় জেল পরিষদের ভোট দেখেই। কেননা গ্রাম পঞ্চায়েত বা পঞ্চায়েত সমিতির ভোটে বেশিরভাগ সময়েই প্রতীকের থেকেও ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠেন, প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনসংযোগ ছোট ছোট এলাকার ভোটে মাপকাঠি হয়ে যায়। কিন্তু জেলা পরিষদের ভোট হয় অপেক্ষাকৃত বড় অঞ্চলে, যেখানে মানুষ ভোট দেন অনেকটা প্রতীক দেখেই। আর তাই গ্রাম বাংলার প্রাকৃত মতামত ঠিক বোঝ গেল কি?

২. পার্শ্ববর্তী সব জেলা পুরুলিয়া, বাঁকুড়া বা ঝাড়গ্রামে প্রবল বিজেপি-উত্থান অথচ বীরভূমে কোনো নির্বাচনই হল না। ফলে সত্যিই যদি ভোটাররা পাশ থেকে সরে যায় তাহলে তা আটকানোর কি ব্যবস্থা করা হবে তা জানার উপায় থাকল না? এটাও বোঝা গেল না ঠিক কত মানুষ এখনো সাথে আছে, অন্যান্য বিরোধীদের অবস্থায় বা কি?

৩. দলনেত্রী নিজে মুখে বলছেন যে পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকে লোক ঢুকিয়ে বিজেপি সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ভালো ফল করেছে। অর্থাৎ পাশের রাজ্য থেকে লোক ঢুকলে তা তাকানোর মত সংগঠনের জোর আর নেই। পশ্চিমবঙ্গের চারিদিকেই এখন প্রায় বিজেপি শাসিত রাজ্য, ফলে আগামী লোকসভা বা বিধানসভার যদি বিরোধীরা একই স্ট্রাটেজি নেয়, তার টোটকা কি?

৪. দলনেত্রী বলেছেন টাকা ছড়িয়ে বিজেপি ভোটে জিতেছে। কিন্তু দলের দাবি ছিল তৃণমূলের জামানায় রাজ্যজুড়ে যে উন্নয়ন হয়েছে, তার জোরেই মানুষ ভোট দেবেন। কিন্তু দলনেত্রীর কথাতেই স্পষ্ট উন্নয়নের থেকেও ভোটের দিনের ‘টাকার’ জোর বেশি! তাহলে উন্নয়ন তত্ত্বে আগামী নির্বাচনগুলি কিভাবে এগোনো যাবে?

৫. যতই বলা হোক দলের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রোখা যাচ্ছে না। নির্দল ও গোঁজপ্রার্থীদের সৌজন্যে এবারের পঞ্চায়েতেই তা পুরোপুরি বেআব্রু, আগামীদিনে বিরোধীরা এর সুযোগ না নিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন ভাবার কারণ নেই। অথচ সেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সামলাতে স্পষ্ট দিশা কই?

৬. দলের শীর্ষনেতৃত্ত্ব বলেছে বিজেপির লোকেরাই এবারের নির্বাচনে তৃণমূল সমর্থকদের মেরেছে, ফলে ১৪ জন দলীয় কর্মী মারা গেছেন। তারমানে কি বিজেপির সংগঠন এই রাজ্যে এতটাই শক্তিশালী হয়ে গেছে যে এসে মেরে দিয়ে চলে যাচ্ছে, তা তাকানো যাচ্ছে না? যদি তাই হয়, আগামীদিনে এই প্রবণতা আরো বাড়বে? কিভাবে তা আটকানো হবে?

৭. আপাতত দলের ‘ক্রাইসিস ম্যানেজের’ অরূপ বিশ্বাস বা দলের ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের’ অন্যতম মুখ শুভেন্দু অধিকারী যেসব জেলার দায়িত্ত্বে সেখানে ফলাফল দুর্দান্ত। কিন্তু দলের আরেক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের’ অন্যতম মুখ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়িত্ত্বে থাকা জেলাগুলিতে বিজেপির বেশ রমরমা। দলের এতদিনের নীতি ভালো কাজে পুরস্কার, কাজ না করতে পারলে তিরস্কার এক্ষেত্রেও মানা হবে তো? যদি নাহয় তাহলে মুকুল রায়ের তোলা ‘পরিবারতন্ত্রের’ অভিযোগ আরো জোরালো হবে – কিভাবে সামলানো হবে সেই সব?

৮. পঞ্চায়েত ভোটে বহু আসনে বিরোধীরা প্রার্থী দিতে পারেনি, বা ভোটগ্রহণের দিন এজেন্ট। অর্থাৎ বিজেপি শীর্ষনেতৃত্ত্ব সেইভাবে গুরুত্ত্ব দেয় নি পঞ্চায়েতকে। তাতেও প্রধান বিরোধী হওয়ার প্রবল দাবিদার বিজেপি। আগামী লোকসভা বা বিধানসভাতে এই জিনিস হবে না – সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপাবে ‘রক্তের গন্ধ পেয়ে যাওয়া বাঘের’ মত – কি ভাবে সামলানো হবে তা?

৯. সারদা বা নারদের মত বিষয়গুলি আপাতত ধামাচাপা আছে, কিন্তু তাতে নাম জড়িয়ে আছে দলের অনেক হেভিয়েটের। যদি নির্বাচনের আগে সেগুলি আবার ডালপালা মেলে কি হবে? বিজেপি তো কথায় কথায় জানাচ্ছে – দলের অর্ধেক নেতা জেলে যাবে? কিন্তু তা কাউন্টার করার পাল্টা যুক্তি কোথায়? ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ এই শব্দবন্ধ দিয়ে কি সত্যিই সেই ‘ক্রাইসিস’ সামলানো যাবে?

১০. মুকুল রায় দল ছাড়ার পর দল জানিয়েছিল – তাঁর দলত্যাগ কোনো ফ্যাক্টর নয়। অথচ শেষপর্যন্ত মুকুল রায়কে নিয়ে মুখ খুললেন দলনেত্রীও! মুকুল রায় বিজেপিতে যাওয়ার পর এতদিন বাংলায় বিজেপি যা করতে পারে নি তাই এবারের নির্বাচনে করে দেখালো। তিনি যে দলের নীচুতলায় ভাঙন ধরাচ্ছেন জলের মত পরিষ্কার, যতই তা বাইরের বিশ্বের কাছে অস্বীকার করা হোক। তৃণমূল না ভাঙলে পঞ্চায়েতে এত আসনে প্রার্থী দিতে পারত না বিজেপি। আর এবার তো মরিয়া হয়ে মুকুল রায় আরো বড় ভাঙ্গনের পরিকল্পনা করবেন – কিভাবে সামলানো হবে তা?

আপনার মতামত জানান -

Top
error: Content is protected !!