এখন পড়ছেন
হোম > বিশেষ খবর > ‘দিদির দপ্তরে’ আরটিআই করার ‘দুঃসাহস’ দেখিয়ে বেধড়ক মার খেলেন বাম মনোভাবাপন্ন নেতা

‘দিদির দপ্তরে’ আরটিআই করার ‘দুঃসাহস’ দেখিয়ে বেধড়ক মার খেলেন বাম মনোভাবাপন্ন নেতা

গতকাল দুপুরে নিজের অফিসে দাঁড়িয়েই ‘বহিরাগতদের’ হাতে বেধড়ক মার খেলেন বামমোনোভাবাপন্ন সরকারি কর্মচারী সংগঠন ‘স্টিয়ারিং কমিটির’ নেতা সংকেত চক্রবর্তী। এই ব্যাপারে সংকেতবাবুর সঙ্গে প্রিয় বন্ধু বাংলার তরফে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গতকাল দুপুরের খাবার শেষ করে নিজের অফিসের করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলাম বাড়িতে একটা ফোন করব বলে। হঠাৎ করে সামনের কনফারেন্স রুম থেকে প্রায় ১৫-২০ জন বেরিয়ে আসে, তাদের মধ্যে আমার নিজের দপ্তরের ২-৩ জন থাকলেও বেশিরভাগকেই চিনি না, পরবর্তীকালে জানতে পারি তারা অন্য দপ্তরের। আমার নিজের দপ্তরের ছেলেগুলি আমার দিকে আঙ্গুল তুলে পুরো দলটাকে ‘ওইটা’ বলে চিনিয়ে দিল। তখন বুঝতে পারি নি ঠিক কি হতে চলেছে। এরপরেই পুরো দলটি আমার দিকে এগিয়ে আসে এবং একজন আমার বাঁদিকে প্রচন্ড জোরে আচমকা একটি ঘুঁষি মারে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হুমড়ি খেয়ে উল্টো হয়ে রেলিঙের উপর পরে যেতেই, আমার উপর পিছন থেকে কিল-চড়-লাথি-ঘুঁষি অকাতরে নেমে আসতে থাকে। আমি তখন প্রাণভয়ে ‘বাঁচান, বাঁচান’ করে চিৎকার করছি। এইসময় এক সরকারি অফিসার সেখানে এসে আমাকে উদ্ধার করে নিজের কেবিনে নিয়ে যান, সত্যি কথা বলতে গতকাল ওনার জন্যই প্রাণে বেঁচে যাই।

সংকেতবাবু আরো জানান, আমার সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণকারীদের কয়েকজনও সেই অফিসারের ঘরে যান। অফিসার তখন জিজ্ঞাসা করেন, আমাকে এইভাবে সরকারি অফিসের মধ্যে মারধরের কারণ কি? জবাবে আক্রমণকারীরা জানায়, আমি নাকি তাদের ছবি তুলছিলাম! আমি কোনো কিছু না বলে, আমার মোবাইলটি পকেট থেকে বার করে অফিসারের সামনে রাখতেই সবার মুখ বন্ধ হয়ে যায় প্রথমে। কেননা আমার মোবাইলটি অতি পুরোনো, ছবি তোলা তো দূরের কথা, ফোন আসা ও ফোন যাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজই ওই মোবাইলে করা সম্ভব নয়। আর তারপরেই আসল সত্য সামনে বেরিয়ে আসে। ওই অফিসারের সামনেই অকথ্য গালিগালাজ করে আমাকে রীতিমত ভয় প্রদর্শন করা হয় এবং বলা হয় ‘দিদির দপ্তরে’ কোন ‘দুঃসাহসে’ আমি আরটিআই করছি? এমনকি এই প্রসঙ্গে আমাকে খুনের হুমকিও দেওয়া হয়। তখন আসল ব্যাপার আমার কাছে সব কিছু পরিষ্কার হয়। আসলে মহাকরণে চিটফান্ড দুর্নীতিতে মূল-অভিযুক্ত এক তৃণমূল মনোভাবাপন্ন নেতাকে দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশ নাকি খুঁজে পাচ্ছে না, অথচ তিনি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে বসে কাজ করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। আমি আরটিআই করে তাঁর উপস্থিতির রেকর্ড জানতে চাই দিন দশেক আগে, ফলে চাকে এইভাবে ঢিল মারতেই আমার উপর এইভাবে শারীরিক হেনস্থা, তাও আবার নিজের সরকারি দপ্তরে নেমে এল।

এরপরে সংকেতবাবুর বক্তব্য, ওই মারধরের ঘটনায় আমি শারীরিকভাবে বেশ ভালো রকমের চোট পাই। প্রাথমিক চিকিৎসা করাতে আমাকে হাসপাতালে পর্যন্ত যেতে হয়। এরপর চিকিৎসা করিয়ে যখন ফেরত আসি, ততক্ষনে দপ্তর বন্ধ হয়ে গেছে। তাই সব ঘটনা জানিয়ে আমি বিধাননগর থানায় একটি রিপোর্ট করেছি এবং আগামী সোমবার অফিস খুললে, আমি সেখানেও সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জনাব। সংকেতবাবুর এই শারীরিক নিগ্রহের ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই দলমত নির্বিশেষে নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে। সংকেতবাবুর নিজের কথা অনুযায়ী, তৃণমূল প্রভাবিত সরকারি কর্মচারী সংগঠন বাদে সকলেই আমাকে ফোন করে বা দেখা করে এই ব্যাপারে পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। কো-অর্ডিনেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করেন, সরকারি কর্মচারী পরিষদের দেবাশিস শীল আমাকে ফোন করে এই লড়াইয়ে পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। আইএনটিইউসিএর মলয় মুখার্জি আমার পাশে থেকে থানা পর্যন্ত গেছেন। কলকাতায় আরটিআই ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সৌমেন ভট্টাচার্য্য এই ঘটনায় আমার পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে সরকারি কর্মচারী পরিষদের আহ্বায়ক দেবাশিস শীলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমরা বহুদিন আগে থেকেই এই আশঙ্কা করেছিলাম, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শাসকদল সরকারি কর্মচারীদেরও আর রেহাই দিচ্ছে না। পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠন এই ধরনের মারধরের সংস্কৃতি শুরু করেছে। আর এবার তো সবকিছু ছাড়িয়ে গিয়ে একদম দপ্তরে ঢুকে শারীরিক ভাবে সরকারি কর্মচারীদের হেনস্থা শুরু হয়ে গেল। সরকারি কর্মচারীরা যে কত অসহায় এবং সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা যে কিভাবে এই রাজ্যে হরণ করা হচ্ছে সংকেতবাবুর ঘটনা তার জ্বলন্ত প্রমান। সমগ্র ঘটনার আমরা তীব্র নিন্দা করছি এবং সংকেতবাবুর পাশে আমরা সর্বতভাবে আছি।

আপনার মতামত জানান -
Top
error: Content is protected !!