এখন পড়ছেন
হোম > রাজ্য > বর্ধমান > ‘করেন তো প্রাইমারি চাকরি, কি ভাবেন নিজেকে? থাবরে আপনার মুখ ভেঙে দেব!’

‘করেন তো প্রাইমারি চাকরি, কি ভাবেন নিজেকে? থাবরে আপনার মুখ ভেঙে দেব!’

রাজ্যের প্রশাসনিক আধিকারিকদের একাংশ কি আর রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষকদের – শিক্ষকের পর্যায়ে মানেন না? শিক্ষক হিসাবে ছেড়ে দিন, তাঁরা কি আর প্রাথমিক শিক্ষকদের ‘মানুষের’ গোত্রেও ভাবেন না? প্রশ্নটা উঠছে এবং প্রশ্নটা তুলছেন শিক্ষকদেরই একাংশ এবং এই নিয়ে ধুন্ধুমার আজ পূর্ব-বর্ধমান অতিরিক্ত জেলা শাসকের দপ্তর। পূর্ব-বর্ধমানের অন্তর্গত নীলপুর হরিপদ এফ পি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অভিষেক মন্ডলের সঙ্গে যা হয়েছে – তার জেরেই বর্তমানে গোটা রাজ্য জুড়ে প্রতিবাদ আর সমালোচনার ঝড় বয়ে চলেছে।

ঘটনার বিস্তারিত জানা যাচ্ছে – প্রাথমিক শিক্ষার ডিস্ট্রিক্ট ইন্সপেক্টরকে ও ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে অভিষেকবাবুর লেখা এক করুন পত্র থেকেই। সেই পত্রে অভিষেকবাবু নিজের পরিচয় বিস্তারিত প্রথমে জানিয়ে লিখেছেন, গত ২৪ শে আগস্ট নির্বাচন দপ্তর থেকে ডিও হিসাবে ভোটার লিস্টের কাজ করার জন্য আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আসে। সেই মোতাবেক অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাওয়া মাত্র নির্বাচনী দপ্তরের সেকন্ড অফিসার মাননীয় দাস বাবুর সাথে দেখা করি এবং ‘বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব জনিত কারণে’ ডিও ডিউটি থেকে অব্যাহতির জন্য ওনাকে লিখিত অনুরোধ জানাই। উনি আমার আবেদনপত্র গ্রহণ করেন এবং মৌখিক ভাবে বলেন বিষয়টি বিবেচনা করবেন। এমতবস্থায় নির্বাচনী দপ্তর থেকে আমার বিদ্যালয়ে উনি নিজে আসেন এবং ছাত্র ও শিক্ষক রেজিস্টার দেখেন।

অভিষেকবাবু আরো লিখেছেন, সব কিছু দেখার পরেও উনি আমাকে ডিও ডিউটি করতে বাধ্য করেন। আমি তখন অতি বিনয়ের সাথে তাঁকে জানাই যে – এই নিয়ে আমার আবেদন পত্র দেওয়া আছে। এই ব্যাপারে এসডিও মহাশয়ের সাথে দেখা করে কথা বলি, তারপর উনি যা নির্দেশ দেবেন তাই করব। কিন্তু, আমার কথা শেষ হওয়া মাত্রই আমার বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষের মাঝেই আমাকে চিৎকার করে উনি বলতে থাকেন – আপনাকে আমি দেখে নেব, আপনি কত দূর যেতে পারেন আর আমি কত দূর যেতে পারি। আপনি তৈরি হয়ে থাকুন!

অভিষেক তাঁর পাত্রে আরো লিখেছেন, এই ঘটনার সূত্র ধরে গত ১১ ই সেপ্টেম্বর নির্বাচনী দপ্তর থেকে আমার নামে একটি ‘শো-কজ’ চিঠি আসে। তৎক্ষণাৎ ওই শো-কজের উত্তর লিখিতভাবে দিয়ে আমি নির্বাচনী দপ্তর থেকে ২৩৪ পার্ট/২৬০-বর্ধমান দক্ষিণ বিধানসভার ডিও ফাইল নিয়ে আসি এবং কাজ শুরু করি। কিন্তু, গত ১২ ই সেপ্টেম্বর আমাকে নির্বাচনী দপ্তর থেকে আমার ডিও হিসাবে কর্মরত অবস্থায় বার বার ফোন করে জানানো হয় যে, এসডিও মহাশয় আমাকে বলেছেন – “আমি প্রথমবার এই ভুল করে ফেলেছি। জীবনে আর কখনো এই রকম ভুল হবে না। আমার আমার ভুলের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করছি” – এটা লিখে জমা দিতে হবে।

আরো খবর পেতে চোখ রাখুন প্রিয়বন্ধু মিডিয়া-তে

এবার থেকে প্রিয় বন্ধুর খবর পড়া আরো সহজ, আমাদের সব খবর সারাদিন হাতের মুঠোয় পেতে যোগ দিন আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রূপে – ক্লিক করুন এই লিঙ্কে

অভিষেকবাবু এরপরে লিখেছেন, আমি নির্বাচনী দপ্তরে লাইক নিয়ে যাই – “গত ১২ ই সেপ্টেম্বর থেকে আমি ২৩৪ পার্টের কাজ শুরু করেছি এবং ঐ পার্টের কাজ সম্পুর্ন স্বাভাবিক ভাবে চলছে”। কিন্তু, নির্বাচনী দপ্তর থেকে ওই লেখা জমা নিতে অস্বীকার করা হয়। অনন্যপায় হয়ে আমি এসডিও মহাশয়ের সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানাই। নির্বাচনী দপ্তরের আপত্তি সত্ত্বেও আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানাই। কিন্তু, এসডিও সাহেব আমাকে দেখা মাত্রই আমার কোনো কথা না শুনেই আমাকে অকথ্য ভাষায় চিৎকার শুরু করেন।

অভিষেকবাবু এরপরেই চিঠির পরের অংশে এসডিওর তাঁর প্রতি মর্মান্তিক শব্দবানের ডালি তুলে ধরেছেন। অভিষেকবাবুর লেখনীতে এসডিও সাহেবের বক্তব্য – কত দিন চাকরি করছেন? আপনার চাকরি খেতে আমার কয়েক মিনিট লাগবে! কোন এসআই, কোন নেতা আপনাকে বাঁচাতে আসবে? আপনি কি ভাবেন এখানে সব গরু-ছাগল বসে আছে? কত বড় নেতা হয়েছেন আপনি? টিআইসি বলে ক্ষমতা দেখাচ্ছেন? আপনাকে প্রথমে সাসপেন্ড করব, তারপর বেতন বন্ধ করব, তারপর তিন বছর জেল খাটাবো – পরে, কোর্টে আপনার সাথে দেখা হবে! থাবরে আপনার মুখ ভেঙে দেব – আপনার এত বড় সাহস যে আপনি ইলেকশন ডিউটি নিতে অস্বীকার করেছেন? করেন তো প্রাইমারি চাকরি, কি ভাবেন নিজেকে? দেখবেন আমার ক্ষমতা? আপনাদের চাবকে পিঠের ছাল তুলে দেওয়া উচিত। চলে যান আমার সামনে থেকে, আমি আপনার মুখ দেখতে চাই না!

এই করুণ বাক্যনিবন্ধ তুলে ধরে শিক্ষক অভিষেকবাবুর করুন বক্তব্য, উক্ত অত্যন্ত অসম্মানজন কথাবার্তা ও মানসিক হেনস্থার পর থেকে আমি মানসিক ভাবে সম্পুর্ন বিধ্বস্ত এবং অসুস্থ বোধ করছি। আর এই ঘটনা সামনে আসতেই সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে গোটা রাজ্য জুড়ে। এই প্রসঙ্গে শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চের অন্যতম শীর্ষনেতা মইদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, রাজ্য জুড়ে যে কি গণতান্ত্রিক অবস্থা চলছে, এই সকল ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ। যেসব শিক্ষকরা সমাজের পরবর্তী প্রজন্মকে বেড়ে উঠতে শিক্ষাদান করেন, তাঁদেরকে আর মানুষের পর্যায়েও ফেলেন না আমাদের প্রশাসনের একাংশ।

মইদুলবাবু আরো বলেন, শিক্ষকদের নিয়ে গোটা রাজ্য জুড়েই একের পর এক অন্যায়-বেআইনি কাজ চলছে। আপনি প্রতিবাদ করতে গেলেই আপনাকে ধমকে-চমকে রাখা হবে! সাম্প্রতিক কালেই, শিক্ষক শাশ্বত ঘোষ সামান্য দুটি প্রশ্ন করাই তাঁর সঙ্গেও প্রায় একই রকম দুর্ব্যবহার করা হয়েছিল। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে নামখানার স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কি করা হল? সর্বোপরি এইসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে আমি বা আমাদের সংগঠন শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সত্যি কথাটা বলছে বলে আমাকে বহিরাগত দুষ্কৃতী এনে হত্যার পর্যন্ত পরিকল্পনা চলছে! পশ্চিমবঙ্গে, যে শিক্ষকদের কি নিদারুন ও করুণ হাল হয়েছে – এইসব ঘটনাতেই তা প্রমাণিত হচ্ছে বারম্বার।

আপনার মতামত জানান -
Top
error: Content is protected !!