এখন পড়ছেন
হোম > অন্যান্য > রাই-কেশব (লাভ স্টোরি ) কলমে – অপরাজিতা = পর্ব ৭

রাই-কেশব (লাভ স্টোরি ) কলমে – অপরাজিতা = পর্ব ৭

মিসেস মুখার্জী বলতে শুরু করলেন ওর বাড়ি নাদিয়ায়। শ্রী হবার আগে ওর মায়ের একটা ছেলে ছিল। প্রায় ৩ – ৪ বছরের মাথায় খেলতে খেলতে পুকুরে পরে যায়, বাচ্চাটা মারা যায়। ওর মা সেটা সামলাতে পারেনি। সেই থেকেই ওর মায়ের একটা প্রব্লেম শুরু হয়। আস্তে আস্তে যদিও ঠিক হয়ে যান কিন্তু সেটা সাময়িক। তারপর যখন জানা যায় তিনি প্রেগনেন্ট তখন থেকেই ওর মা ভাবতে শুরু করে তার সেই ছেলেই ফিরে আসছে তার কাছে। কিন্তু হয় শ্রী। মেয়ে হয়েছে শুনে কিছুতেই বিশ্বাস করেনি ওর মা। ওর মায়ের ধারণা তার ছেলেকে পাল্টে নিয়ে কেউ এই মেয়েকে তার কাছে দিয়েছে। হাজারবার চেষ্টা করেও বোঝানো যায়নি শ্রী তার মেয়ে। তিনি এখনো সেটাই বিশ্বাস করেন।

ও হবার পর ওর মা ওকে দুধ সুদ্দু খাওয়ায়নি।বাড়ির লোক আস্তে আস্তে চেষ্টা করে ওকে ওর মায়ের কাছে দেওয়ার কিন্তু কাজ হয়নি, ঠেলে সরিয়ে দিতো ,ফেলে দিতো। ওর ঠাকুমা ওকে মানুষ করে। ঠাকুমাকেই মা বলে জানে ও। আস্তে আস্তে বড় হয়। তখন ৩-৪ বছরের ফের ওর মায়ের একটা ছেলে হয়। তাকে নিয়ে একটু সুস্থ হয় ইন্দিরা। কিন্তু শ্রীকে দেখতে পারত না। ছেলের কাছে ঘেঁষতে দিত না। মায়ের ভালোবাসা কোনোদিনই পায়নি শ্রী।

এদিকে ওর কাকার বিয়ে হয়। কাকিমা ওকে একেবারে দেখতে পারতো না। কেননা ওর কাকু ওকে খুব ভালোবাসতো। তার ধারণা ছিল কাকা কাকিমার থেকেও বেশি কেয়ার করে শ্রীর। এখন যেমন ওকে দেখছো কোনোদিনই এমন ছিল না ও। চুপ করে কথা শুনবে এমন তো নয়, ওকে ওর জেঠিমা কটকটি বলতো। সবাইকে তাবড়াচ্ছে। তাকে ধরে রাখা যায়না। পছন্দ না হলে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। আমি গিয়ে দেখেছি, বাবা কি কান্ড করে বেড়াচ্ছে ওই টুকু মেয়ে। দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।ফলে সবার কাছে খারাপ।

রনো – আপনি ওদের আত্মীয়?

মিসেস মুখার্জী – হ্যাঁ , রক্তের সম্পর্কের কেউ নয়, আমার স্বশুরমশাই খুব গরিব ছিলেন , আর তোমার আঙ্কেল পড়াশোনায় খুব ভালো। শ্রীর দাদু নিজের ছেলেদের কাউকে পড়াশোনা তেমন করতে পারেননি।কিন্তু মনের মধ্যে একটা ইচ্ছা ছিল তোমার আঙ্কেলের কথা শুনে তাকে তোমার আঙ্কেলকে পড়ান, নিজের আর একটা ছেলে ভাবতেন তোমার আঙ্কেলকে। তোমার আঙ্কেলের সাথে আমার উনিই বিয়ে দিয়েছিলেন। ওনার জন্যই এই চাকরি,বাড়ি সব। উনি না পড়ালে তোমার আঙ্কেল কিছু করতে পারতেন না।

রাহুল – তারপর কি হলো?

মিসেস মুখার্জী – তারপর বেশ চলছিল,কাকিমার একটা ছেলে হয়, সে যখন একটু একটু বড় হয়েছে তখন কোনো একদিন শ্রী বাইরে গেছে দেখে তার পিছু পিছু বাইরে গেছে। সেখান থেকে পুকুরে পরে যায় , কেউ দেখে ফেলে বাঁচায় , কিন্তু কাকিমা দাবি করে যে ওকে শ্রী হিংসা করে জলে ফেলে দিয়েছে। সে ছেলেকেও মিশতে দিতো যান শ্রীর সাথে। কাকাও পর হলো। জেঠিমা আগে থেকেই দেখতে পারতো না. ভাবতো স্বশুর মশাই সব সম্পত্তি ওই মেয়েকে দিয়ে যাবে। কিছু পাবে না তার ছেলে মেয়েরা। এক এক করে সবাই পর হলেও দাদু, ঠাকুমা শুধু ছিল ওর। এত কষ্টতেও ওকে দমাতে পারেনি কেউ। আমাকে খুব ভালোবাসতো ও। তারপর দাদু মারা গেলো। ঠাকুমা অনেক কিছু ইচ্ছা থাকলেও করতে পারতো না। ছেলেরা ভরসা। টাকাপয়সার অভাব রাখেন নিন ওর দাদু। শ্রীর নাম মোটা টাকা রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু শ্রীর এবার পরে রইলো শুধু ঠাকুমা।

ও পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। কিন্তু ১২ ক্লাস পরীক্ষার আগে দোলের দিন সব কিছু অন্যরকম হয়ে যায়। ওর কাকিমার দাদার ছেলে সে ডাক্তারি পড়ছিলো। প্রায় আসতো ওদের বাড়িতে। দোলের দিন ছিল ওদের বাড়িতে সেই ওকে….চুপ করে গেলেন মিসেস মুখার্জী।

অদিতি – মানে,ও, ওকে

মিসেস মুখার্জী – না যতটা খারাপ ভাবছো ততটা কিছু হয়নি। চিৎকারে লোকজন জড়ো হয়ে যায়। ছেলেটা নিজেকে বাঁচাতে শ্রীর নামে দোষ চাপায় যে শ্রী ওর সাথে অসভ্যতামি করছিলো। আজেবাজে ইঙ্গিত করছিলো। ও চাইছিল না বলে এমন চেঁচিয়ে লোক জড়ো করেছে এইসব। ঠাকুমা ছাড়া বাকি সবাই সেটা মেনে নিয়েছিল। ছোট কাকিমা, জেঠিমা এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি। মা তো আগেই চাইতো। বিনা দোষে নির্বাসনে পাঠানো হলো ওকে। ঠাকুমা চেষ্টা করেও আটকাতে পারেনি। ওনার কথা শোনে নি কেউ।

আর প্রথমে ওর এক পিসির বাড়ি যায়। সেখানে থেকেই ১২ ক্লাস এর এক্সাম দেয় ও। তারপর আমার সাথে যোগাযোগ করে ওরা। এখানে পাঠিয়ে দেয় ওকে , আমাকে বলেছিলো ছেলে দেখছে বিয়ে দিয়ে দেবে যতদিন ছেলে না পাওয়া যায় ততদিন ও এখানে থাকবে। দরকার হলে এখন থেকেই বিয়ে দেওয়া হবে।কেননা এলাকায় রটে গেছে , ওই মেয়েকে কেউ বিয়ে করতে চাইবে না।

রনো – বিয়ে দিয়ে দেবে, এতে শ্রীর কি দোষ ?

রাহুল -হ্যাঁ তাইতো? যে ওকে মলেস্ট করতে চাইলো সে সাধু আর সব দোষ শ্রীর

মিসেস মুখার্জী – ওর দোষ ও মেয়ে। ওর দাদু থাকলে এমন কিছু ঘটনা না, কিছুতে শ্রী কে কাছ ছাড়া করতেন না।অবশ্য ওর জ্যাঠার ছোট ছেলে বাড়িতে থাকলেও হয়তো আটকাতো। সে শ্রীকে ভালোবাসে। এখনো সেই যোগাযোগ রেখেছে। কিছু দরকার লাগবে কিনা সেই দেখে।

এখন তো অনেক ভালো দেখছো। কিন্তু তখন রোজই প্রায় ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতো। রোজ  ঘুমের ঘোরে ভয়ে চেঁচাতো। কোনো মতে ১২ ক্লাস পাস্ করে ও। এখানে আমি ওকে কলেজে ভর্তি করে দিই। মনে হতো সবার সাথে মিশলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিলো। আমার এই পেয়িং গেস্ট রাখাও ওর জন্য। আমার মেয়ে যতদিন ছিল ওর সাথে থাকতো। তারপর একা হয়ে যাবে ভেবে পেয়িং গেস্ট রাখলাম। কিন্তু না কারুর সাথেই মিশতো না। তারপর একটু একটু করে সুস্থ হচ্ছে দেখে আমি ওকে একা থাকতে দিই।

প্রথম প্রথম খুব কাঁদতো। বাড়ি যেতে চাইতো। ঠাকুমাকে দেখতে চাইতো, আমি কয়েকবার বলেছিলাম কিন্তু বাড়ি থেকে রাজি হয়নি।

রনো – ওকে আর বাড়ি থেকে নিতে আসেনি?

গলা বুজে আসছে মিসেস মুখার্জীর তাও বলে গেলেন। এসেছিলো ওর কাকা আর বাবা। ওর জন্য ছেলে দেখেছে বিয়ে দেবে। ও বিয়ে করতে রাজি হয়নি। আর তারপর ওর ঠাকুমা মারা যায় ওকে একবারের জন্য বলেনি যে ঠাকুমার শরীর খারাপ একবার দেখে যেতে। ওর দাদা ফোন করে বলেছিলো। নিয়ে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু ও আর যায়নি। আমি বলেছিলাম শেষ দেখা দেখে আয়, কিন্তু ও যায়নি। বলেছিলো ও ওই মালা পড়া মুখটা আর দেখতে পারবে না। এই হলো শ্রীর কাহিনী।

রাহুল – সাদা পরে কেন? হোলির দিন ওই ঘটনাটা ঘটেছিলো বলে।

মিসেস মুখার্জী – হুম, আমি বলতাম প্রথম প্রথম। তখন আমাকে বলেছিলো ওর জীবন থেকে সব রং হোলির দিনেই চলে গেছে।ওর জীবনটা এখন সবটা সাদা। কোথাও ছিটে ফোঁটাও রং নেই।

ও খুব রং খেলতে ভালোবাসতো। রাধা কৃষ্ণের খুব বড় ভক্ত ছিল। ওর দাদু ওকে একটা মূর্তি দিয়েছিলো রাধা কৃষ্ণের, বলেছিলো গোটা সংসারে যখন কেউ থাকবে না ওর রাধা কৃষ্ণ থাকবে ওর সাথে। খুব মানত ও , নিজের বন্ধুর মতো। খুব সুন্দর করে সাজাতো, আমিও দেখেছি। কিন্তু যখন এখানে এলো সেটাও নিয়ে আসেনি। আমাকে বলেছিলো সব সম্পর্ক চুকিয়ে সেটা ও জলে ফেলে দিয়েছে।

কিছু বললে বলে – আমার কেউ নেই জানতো আন্টি, থাকলে এমন হতো বলো। সত্যিই যদি রাধা কৃষ্ণ আমার বন্ধু হতো তবে সেদিন আমার সব কিছু কেন কেড়ে নিলো? তুমি চিন্তা করো না এই কদিনে আমি একা থাকতে শিখে গেছি। তুমি ও কোন দিন আমাকে একা ছেড়ে চলে যাবে। একই তো থাকতে হবে বলো। আমি পারবো। কেঁদে ফেলেছেন মিসেস মুখার্জী।

একটু থেমে বললেন – আমি চলে গেলে ওর কি হবে? খুব চিন্তা হয়। আমার মেয়ের সাথে কি যাবে ও ?

অদিতিও চোখ মুছছে।

রনো মিসেস মুখার্জীর হাতটা ধরে বললো – আমরা আছি আন্টি।

রাহুল বললো- হ্যাঁ আন্টি, শ্রী কে ভালো করার জন্য আমরা যতদূর যেতে হয় যাবো। আপনি ভাববেন না।

অদিতি – আমরা ওকে ছেড়ে যাবো না।

রনো – আচ্ছা কেশব কে?ও বলছিলো আমি কেশবকে বলে দেব, কেশব তোমাকে মেরে ফেলবে।
কেশব কে ? কেশব বলে কাউকে ভালোবাসতো?

মিসেস মুখার্জী – জানিনা, আমিই অনেকবার শুনেছি। আগে বার বার ওই নামটা বলতো ঘুমের মধ্যে। কৃষ্ণকে তো খুব ভালোবাসতো তাকেই কেশব বলে। যতই মুখে বলুক আমি মানিনা মনের মধ্যে এখনো হয়তো কৃষ্ণ আছে। শুধু কৃষ্ণ কি চায় যেটাই বুঝিনা।

হঠাৎ রনো বললো – আন্টি, ওর পুরোনাম কি?

মিসেস মুখার্জী – শ্রীরাধা

রনো – আর ডাকনাম ?

মিসেস মুখার্জী – রাই বলে ডাকতো ওকে সবাই, আমিও ডাকতাম। কিন্তু ওই মানা করেছিল ডাকতে। সেই থেকে শ্রী বলেই ডাকি।

রনো মুখে হাতটা দিয়ে খাটে মাথাটা এলিয়ে দিলো। রাহুল, অদিতি কিছু একটা আন্দাজ করেছে।

রনো নিজেকে সামলে শ্রীর কাছে গিয়ে ওর কপালে হাত দিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছে। অদিতি উঠে গেলো হয়তো আন্টি কিছু ভাববে।
শুনলো রনো বলছে – সরি। অদিতি গায়ে হাত দিয়ে বললো আন্টি জ্বরটা অনেকটা কমেছে।

রনো বললো আমি একটু আসছি। বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে রাহুলও গেলো।

রনো বাইরে গিয়ে একটা সিগারেট খাচ্ছে আর কিছু ভাবছে ,

রাহুল – রনো, কি হয়েছে? তুই নামটা শুনে ঐভাবে রিএক্ট করলি কেন? তুই কি চিনিস ওকে।

রনো – হয়তো অনেক কিছু বুঝতে পারছি তবুও সবটা জানা দরকার। ডাইরিটা দরকার আছে আমার। বাকিটা শ্রী বলবে। আমি সবটা না জেনে কিছু বলতে পারবো না।

ফোন বেজে উঠলো। মা কল করেছে এত রাত্রে ?

রনো – কি হয়েছে? ওপাশ থেকে কিছু একটা কথা ভেসে এলো। রনো চেঁচিয়ে বললো – রাত ১ টা বাজছে। তুমি বিয়েবাড়িতে আছো বলেই আমি বিয়েবাড়িতে নেই। আমি এখন কারুর সাথে কথা বলতে পারবো না। আর আমি কাকে বিয়ে করবো সেটা আমি ঠিক করবো তুমি না। ফোনটা কেটে দিলো।

রাহুল – কি হয়েছে ?

রনো – মা র জন্য আমার লাইফটা হেল হয়ে গেলো। কাকে একটা বিয়েবাড়িতে পেয়েছে আমার সাথে নাকি তার বিয়ে দেবে। আমাকে এখন তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

রাহুল – রাগ না করে ভালো করেও বলা যায়।

রনো – না যায় না। আমি যেটা ভাবছি যদি সেটা হয় তবে মায়ের সঙ্গে সব সম্পক শেষ আমার। শ্রীকে যদি রাজি করতে পারি, রাজি করবোই দেন ওকে বিয়ে করে এখানেই সেটল্ড হবো আমি।

রাহুল সেটাই তো জানতে চাইছি – কি হয়েছে।

রনো – ঘরে চল বলছি তোকে সবটা। তবে অনেক কিছু ক্লিয়ার নয়, আর তার জবাব শুধু শ্রী দিতে পারবে।

 

আগের পর্ব –  রাই-কেশব (লাভ স্টোরি ) কলমে – অপরাজিতা = পর্ব ৬

 

পরের পর্ব – রাই-কেশব (লাভ স্টোরি ) কলমে – অপরাজিতা = পর্ব ৮

—————————————————————————————————————–

 

আপনার মতামত জানান -
Top
error: Content is protected !!