এখন পড়ছেন
হোম > অন্যান্য > রাই-কেশব (লাভ স্টোরি ) কলমে – অপরাজিতা = পর্ব ৯

রাই-কেশব (লাভ স্টোরি ) কলমে – অপরাজিতা = পর্ব ৯

রাহুল ঘরে গেছে। রনো একটা সিগারেট ধরালো। সিগারেটে টান দিতে দিতে ওর ওয়ালেটটা থেকে নূপুরটা বের করলো।ওর ওয়ালেটে কয়েকটা কার্ড, দাদু ঠাকুমার পিকচার আর এই নূপুরটা থাকে। দেখে মনে হয় কত কিছু আছে। নূপুরটা হাতে নিয়ে ওর মনে পড়লো প্রথম যেদিন এটা পেয়েছিলো, সেদিন খুব দেখতে ইচ্ছা হয়েছিল মেয়েটাকে। অনেক রকম ছবি এঁকেছিল , মনে করার চেষ্টা করেছিল স্টেশনে কোনো দাদু ঠাকুমার সঙ্গে তার দাদুর কথা মতো তার জন্মজন্মান্তরের সাথী ছিল কিনা, কোথাও চোখে পড়েছে কিনা।

আজ মনে হচ্ছে সত্যি দাদু হয়তো ঠিক বলতো তার কৃষ্ণই ওর আর রাই এর বন্ধন ঠিক করে রেখেছে। নাহলে এখন ওর এফ আর সি এস করতে লন্ডনে যাবার কথা। সব ঠিক হয়ে গিয়েছিলো, ওর ও ইচ্ছা ছিল।সব কিছু ঠিক থাকলে এখন ও লন্ডনে থাকতো। কিন্তু মায়ের ইচ্ছার কথা শুনে মায়ের উপর রাগ দেখিয়ে না করে দিয়ে এখানে চাকরি নিয়ে চলে এসেছে। মায়ের ইচ্ছা ছেলে এফ আর সি এস করলে কে অনিতা না সুনিতা তার মেয়ের সাথে বিয়ে দেবে, তার হাসব্যান্ড নাকি বড় বিসনেস ম্যান। তাদের ইচ্ছা জামাই এফ আর সি এস করুক। মায়ের বন্ধুদের একেবারে পছন্দ নয় রনোর। তাদের ছেলেমেয়েদেরকেও তেমন পছন্দ নয়। আর সুনিতা না আনিতার মেয়েকেও দেখেছে বাবা মায়ের এনিভার্সারি পার্টিতে অত্যাধিক খোলামেলা, রনো ঠিক অভ্যস্ত নয় এইসবে। রনোর অনেক মেয়ে বন্ধু আছে, তারাও মেশে রনোর সাথে , অনেক ইয়ার্কি করে কিন্তু কোথাও খারাপ মনে হয়না , বিশেষ করে অদিতি, রাহুলের গার্লফ্রেন্ড হবার আগে থেকেই রনোর বন্ধু, রণকে শাসন করে, ভালোবাসে যেমন বন্ধু হয়।

আজ রনোর কাছে অনেক কিছুই পরিষ্কার।ওর মনেও অনেক প্রশ্ন ছিল, কেন নাতাশাকে ভালোবাসতে পারলো না রনো। সত্যি হয়তো রনোও ভালোবেসেছে ওর রাইকে শুধু বোঝেনি। পৃথিবীতে এত মেয়ে থাকতে কেন হঠাৎ করে এখানে এসে শ্রীকে দেখেই ভালোবাসতে গেলো রনো। আজ সত্যি ভীষণ ভালো লাগছে রনোর। মনে হচ্ছে সব পেয়ে গেছে সব কিছু। জ্বরটা কেমন আছে। আর হয়তো আসবে না।  তাছাড়া অদিতিকে কল করে জিজ্ঞাসা করলেও জানা যাবে জ্বর আর এসেছে কিনা। কিন্তু খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। কল করলো অদিতিকে ফোন এন্গেজড। রনো জানে অদিতি রাহুলের সাথেই কথা বলছে। রাহুলের ঘরের দরজায় টোকা দিয়ে বললো। এই অদিতিকে বল দরজাটা খুলতে আমি যাচ্ছি। রাহুল চেঁচিয়ে বললো -ওকে।

অদিতি দরজা খুলে দিয়েছে। অদিতি এতক্ষনে সব গল্পও শুনে নিয়েছে। সে রণকে বললো তাহলে আমরা এবার ‘রাই – কেশব’ এর মিলন দেখবো। রনো হেসে অদিতিকে জড়িয়ে ধরে বললো আমি তো পারলে এখুনি বিয়ে করে নিই, কিন্তু তিনি এখন কত ভাও খাবেন সেটাই চিন্তা। অদিতি রণকে জড়িয়ে ধরে বললো – হবে হবে , সব হবে। এই সুযোগে রাহুল এসে হাজির হয়েছে সে রনো আর অদিতিকে একসাথে জড়িয়ে ধরে বললো – আমরা আছি কি করতে, শ্রী রাজি হবে না মানে। ফটো আর নাম নিয়ে অনেক প্রেম হয়েছে , এবার আসল মানুষটার সাথে প্রেম বিয়ে দুটোই করতে হবে, মানে আমাদের এটা দাবি আর সেই দাবি শ্রীকে মানতেই হবে।

 

অদিতি এবার সরে দাঁড়িয়ে বললো – এই শোন্ না, একটা কথা বলছি সবটাতো জানা হয়ে গেছে তাই না। আর তো ডাইরির দরকার নেই । সো ক্লোরোফর্ম এর প্লানটা ড্রপ কর।

রনো – ওকে , তবে যদি শ্রী নাটক করে ,মানে রাজি না হয় তাহলে কিডন্যাপের প্লানটা এখনো  অন আছে।

অদিতি – রনো ,দেখ, রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে হবে, সবটা ইয়ার্কি নয় ,

রাহুল -অদিতির হাতটা ধরে টেনে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বললো, রেজিস্ট্রেশন বাতিল হলে তুই চাকরি করে খাওয়াবি আমাকে। আর ওকে শ্রী খাওয়াবে।

অদিতি – ছাড় , রনো দেখ, রনো কোথায়?

রনো শ্রীর ঘরে গেছে।

আন্টি শ্রীর পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে গেছেন। শ্রীও অকাতরে ঘুমাচ্ছে। শ্রীর মাথায় হাত দিয়ে দেখলো রনো না জ্বর আর নেই। আন্টি উঠে পড়েছেন।

আন্টি – ও তোমরা। কখন এলে ?

রনো – এইমাত্র আন্টি, আপনি শুয়ে পড়ুন। জ্বর আর নেই।

আন্টি – ও বোস।

রনো – অদিতি একটু চা করবি।

আন্টি – করো, আমি একটু আসছি।

অদিতি চা করতে গেলো। আন্টি ওয়াস রুমে গেছে। রাহুল রনোকে বললো এই সুযোগ ডাইরিটা বের করে নে। আমি বাইরে দেখছি আন্টি আসছে কিনা।

রাহুল বাইরে গেলো। রনো বিছানায় বসে শ্রীকে দেখছিলো একভাবে। তার কানে রাহুলের কথাটা ঢুকেছে কিনা সেটাই একটা প্রশ্ন। রনো শ্রীর খুব কাছে ঝুকে পরে  শ্রীর হাতটা ধরে নিজের গালে ঠেকিয়ে বললো জানিনা কতটা , মাপতে পারবো না, কিন্তু তোমাকেও খুব ভালোবাসে তোমার কেশব রাই। খুব ভালোবাসি তোমাকে। আমি শুধু তোমার কেশব রাই। শুধু তোমার কেশব। তুমি ভালো হয়ে ওঠো আর আমি কিছুতে তোমাকে একা থাকতে দেব না। আমার জীবনের সব রং দিয়ে তোমাকে রাঙিয়ে দেব রাই। আর কিছুতে তোমাকে কষ্ট পেতে দেব না।

শ্রী অস্ফুটে বলে উঠলো – জল।

রনো ওকে জল দিলো। শ্রী উঠে বসতে পারছে না। রনো ওকে তুলে ধরে জল খাইয়ে ফের শুইয়ে দিলো। আন্টি আসছে রাহুল দেখতে পেয়েই ছুটে ঘরে এসে দেখলো রনো শ্রীকে শুইয়ে দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই অদিতি চা নিয়ে এলো। আন্টি ছাড়া বাকি সবাই চা খেলো। রনো আর রাহুল চলে গেলো।

রাহুল রনোকে একটা গালাগালি দিয়ে বললো – ডাইরিটা বের করার একটা সুযোগ ছিল হারালি,বলে এলাম তবুও। যদি তখনি বলিস আমি শ্রীকে দেখবো, তাহলে আমিই বের করে নিতাম।

রনোর এবার মনে হলো সত্যিই তাই ,বললো – হুম তাই তো। যাহ

 

———————————————————————————————————————–

 

রাত্রে ঘুম হয়নি। কেউ হাসপাতাল যায়নি। শ্রী উঠেছে ওদের আগে যথারীতি স্বভাববশত চান করে নিয়েছে। অদিতি উঠে জিজ্ঞাসা করেছে কেন এত সকালে চান করেছে ? জ্বর ছাড়েনি এখনো ভালো করে। পরে স্পঞ্জ করতে হতো।

শ্রী বলেছে – কিছু হবে না, জ্বর হলেও মরবে না, আর ও স্কুলে যাবে।

অদিতি অবাক হয়ে বলেছে স্কুলে যাবে মানে? এখনো জ্বর আছে তোমার। কাল রাত্রে অনেক জ্বর ছিল। আজ রেস্ট নাও। তুমি পুরোপুরি সুস্থ নও।

শ্রী শুনবে না। বলেছে – ভেবোনা শরীর খারাপ লাগলে বাড়ি চলে আসবো।

অদিতি বুঝেছে তার দ্বারা হবে না। রণকে কল করে বলেছে সব।

রনো এসেছে। আন্টি মনে করেন রনো ব্রেকফাস্ট  করতে  এসেছে। বললো বোসো আমি এখুনি কিছু করে দিচ্ছি। রনো বললো – আপনি রান্না করুন। আমি একবার দেখে আসি শ্রী কেমন আছে।

আন্টি – যাও। অন্য কেউ হলে একা একা একটা মেয়ের ঘরে একটা ছেলেকে কিছুতেই ঢুকতে দিতেন না। কিন্তু রনো আর রাহুলকে বড্ডো ভালোবেসে ফেলেছেন মিসেস মুখার্জী। ছেলে দুটোই মাথায় বদ বুদ্ধিতে ভরপুর, ছটফটে হলেও মনে পাপ নেই ওদের। সেদিকে ভরসা করেন মিসেস মুখার্জী। আর তাছাড়া রনো ডাক্তার, শ্রীর জ্বর হয়েছে তাকে দেখতে গেছে এতে কোনো খারাপ ভাবার কারণও নেই।

 

শ্রীর ঘরে এসে দেখলো দরজা খোলা। সে বিছানায় বসে ব্যাগ গোছাচ্ছে। যেমন অদিতি বলেছিলো স্কুল যাবে তেমন তার প্রস্তুতি চলছে।

রনো দরজায় টোকা দিয়ে বললো – আসবো
শ্রী ঘুরে দরজার দিকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে বললো- আসুন।

রনো- শরীর কেমন?

শ্রী -ভালো,

রনো শ্রীর কাছে এসে ওর বিছানায় বসে বললো – বোসো

শ্রী কিছু বললো না. বসলো।

রনো শ্রীর পালস চেক করার জন্য হাতটা ধরলো। রনোর হির্টবিটটা কত তাড়াতাড়ি উঠানামা করছে সেটা রনো বুঝলেও শ্রী বুঝলো না। তবে শ্রীর হির্টবিট যে অনেকটা বেড়ে গেছে সেটা রনো বুঝছে।

হাতটা ছেড়ে বললো – এখনো গা গরম আছে , জ্বর আছে হালকা। রেস্ট নাও।

শ্রী- কিছু হবে না , আমাকে স্কুলে যেতে হবে।

রনো – মেডিসিন নিয়েছো?

শ্রী – হুম.

রনো – সকালে কি খেয়েছো?

শ্রী – চা

রনো – আর ?

শ্রী মাথা নেড়ে জানালো আর কিছু নয়।

রনো দেখলো বিছানার পাশে একটা টেবিলে প্রায় ভর্তি এককাপ চা বসানো। ইশারা করে রনো জিজ্ঞাসা করলো এই চা টা।

শ্রী মাথা নামিয়ে রইলো।

রনো বললো- আন্টিকে বলছি খেতে দিতে কিছু খেয়ে ফের বাকি মেডিসিন খেয়ে নাও। আর আজ বাড়ি থেকে বেরোনোর দরকার নেই।

শ্রী – স্কুলে আমাকে যেতেই হবে।

রনো – আচ্ছা। কাল রাতে জ্বরের ঘোরে কি করেছো মনে আছে ?

শ্রী চমকে উঠে বললো – কি করেছি ?

রনো – ভুল বকছিলে , জ্বর পুরোপুরি সারেনি আজকেও থাকবে। কেশব কে?

শ্রী এবার বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। ব্যাগটা নিয়ে টেবিলের কাছে গিয়ে ব্যাগে বাকি জিনিস ভরতে লাগলো।
রনো বললো – কেশব কে ?
শ্রী বললো – চি চিনি না।

রনো – কাল রাতে বার বার ডাকছিল ওই নামটা ধরে। বলছিলে কেশব তুমি আমার এত কাছে তবু আমার থেকে এত দূরে রয়েছো? আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। তোমার বয়ফ্রেন্ড ?

শ্রী কোনো মতে পালতে চাইছে। রনো বুঝতে পেরেছে তবুও বলতেই থাকলো আরো কিসব বলছিলে যেমন –

শ্রী বললো আপনি এখন যান।

রনো – হুম সে তো যাবো – বাট তুমি ঐভাবে ডাকছিল , শুনে বোঝা যাচ্ছিলো তুমি ওই কেশব কে খুব ভালোবাসো ?

শ্রী – আমি এসব কিছু বলিনি। বলতে বলতেই হাত থেকে পেন দানি মাটিতে পরে গেলো। শ্রী সেগুলো কুড়িয়ে রাখছে ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে রনো ঠিক জায়গায় ঢিল তা ছুড়েছে।

রনো – তুমি বলোনি মানে ? আমরা সবাই শুনেছি। আন্টিও ছিলেন। আর তাছাড়া আমি কেশবকে চিনবো কি করে ? ওই নামটা আমি জানবো কি করে ?

শ্রী- কৃষ্ণ, কৃষ্ণর নাম কেশব।

রনো- ও, কৃষ্ণকে ডাকছিল?

শ্রী – হুম

রনো উঠে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। চুরি করে ধরা পড়লে যেভাবে কেউ দাঁড়িয়ে থেকে সেই ভাবেই শ্রী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।

রনো শ্রীর কাছে এসে ওর কোমরটা ধরে ওর কাছে টেনে নিয়ে বললো – তাহলে কেশব তোমার কৃষ্ণ ? ওকে। তোমার কি মনে হয় আমি কিছু জানিনা। আমি তোমাকে চিনতে পারিনি।

শ্রী নিজেকে প্রানপনে ছাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু রনো ছাড়বে না। শ্রী বললো – আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে , আমাকে ছাড়ুন।

রনো – কি ভুল হচ্ছে?

শ্রী – আমাকে ছাড়ুন।

রনো – এখনো আপনি করে কথা বলবে

অদিতি বাইরে থেকে ডাকলো – রনো আন্টি খেতে ডাকছে।

রনো এবার শ্রীকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বললো – চুপচাপ কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে থাকো। আমি যদি শুনি ইস্কুলে গেছে, ইস্কুলে গিয়ে হাত ধরে টেনে বাড়ি নিয়ে আসবো। শ্রীর দিকে একটু ঝুকে বললো – আর সবথেকে ইম্পর্টেন্ট কথা আমি সবটা জানি, সবটা মানে সবটা। আর আমি জেনে গেছি বলে যদি উল্টোপাল্টা কিছু করার কথা মাথাতেও আনো , তাহলে শোনো আমি ডাক্তারিটা সিরিয়াসলি পড়েছি। কোন মেডিসিন কতটা খেলে মানুষ মরে, হাতের কোনখানটা কাটলে মরা যায় আমি খুব ভালো করে জানি। সো যদি কিছু করো , এই বাড়ি থেকে দুটো বডি বেরোবে। সেই ভেবে কাজ করো। শ্রী কিছু বললো না। মুখটা ঘুরিয়ে নিলো। রনো শ্রীর গায়ে ঢাকা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

 


আগের পর্ব – রাই-কেশব (লাভ স্টোরি ) কলমে – অপরাজিতা = পর্ব ৮

 

পরের পর্ব – রাই-কেশব (লাভ স্টোরি ) কলমে – অপরাজিতা = পর্ব ১০

আপনার মতামত জানান -
Top
error: Content is protected !!