এখন পড়ছেন
হোম > অন্যান্য > পরকীয়া – কলমে অপরাজিতা – ছোটগল্প

পরকীয়া – কলমে অপরাজিতা – ছোটগল্প

উফফ এইসময় একটা সিগাটের পেলে ভালো হতো। হেভি টেনশন হচ্ছে। মেয়েটা কি বলবে কে জানে ? এখন সবটাই তার হাতে।আর এই বুড়োটা? ৯০ পার হয়ে গেছে। আর কি দরকার বাপু, বেঁচে থেকে হার মাস জ্বালানোর। আগে মনে হচ্ছিলো যে ৯০ হয়ে গেছে আর বেশিদিন বাঁচবে না। কিন্তু যা টাট্টু আছে ও এখনো অনেকদিন বাঁচবে। বক্তৃতা দিচ্ছে? মাথা খারাপ করে দিলো। না বাবা বলবে না, ওকে নিয়ে যা যা খারাপ চেয়েছি সেই গুলোই আমার হয়েছে। একবার চেয়েছিলাম বুড়ো অন্ধ হয়ে যাক। কোথাও কিছু নেই আমার চোখে চশমা বসে গেলো। – এখুনি দেখবো আমিই মরে গেলাম।

যাক হাততালি পড়েছে। এবার বুড়ো নামবে। সেই থেকে ভজ ভজ করে কানের পোকা নড়িয়ে দিলো। ঠাকুমা উঠলো। গান করছে, না সরি গানটাকেই কবিতার মতো বলছে। পাশে ছোট কাকিমা হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে। বাবা তাবলা বাজাচ্ছে আপন মনে, কোনো কিছুই মিলছে না।কবিতা, বা গান , হারমোনিয়াম, তবলা যে যার মতো বেজে চলেছে কারুর সাথে কারুর কোনো মিল নেই। আশ্চর্য, খাবার লোভে লোকে বসে সেটা শুনছেও। প্রত্যেক বছর দুবার করে একই জিনিস। কিন্তু মেয়েটা আসছে না কেন? সেই পারে আমাকে একমাত্র বাঁচাতে। বুড়ো আবার এদিকে ওদিকে লক্ষ্য রাখছে। ৯০ বছর বয়সেও দূরের জিনিস স্পষ্ট দেখে। মেয়েটা এলে একটু সাইডে নিয়ে গিয়ে কথা বলতে হবে , বুড়ো দেখতে পেলে আবার কিছুতে ফাঁসিয়ে দেবে।

 

ওহ এতক্ষন ভাবছেন আমি কে? আর বুড়ো কে? কি ব্যাপার। বলছি। তার আগে বলুন কখনো শুনেছেন যে রবীন্দ্রনাথ কাউকে ফাঁসিয়েছেন ?আমাকে দিয়েছেন সেই হয়ে থেকে, ভায়া আমার বাবার বাবার মানে দাদু। দাদু আদ্যোপান্ত রবীন্দ্র প্রেমী। বয়েস যত বেড়েছে পাল্লা দিয়ে পাগলামি বেড়েছে। আর এখন তো মাত্রা ছাড়া। সামনা সামনি দাদু বললেও এমনি সময়ে আমি বুড়োই বলি। কারণ আছে। মেয়েটা যতক্ষণ না আসে বলছি শুনুন।

আমার নাম মহেন্দ্র, যে সে মহেন্দ্র নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের – চোখের বালির মহেন্দ্র। ছোটবেলায় বন্ধুদের অনেকে ভালো নামের পাশে এই মহেন্দ্র নামটা বড় বেমানান লাগতো। আমার পছন্দের ছিল না। কিন্তু বদলাবার সাহস কারো নেই কেননা নামটা ওই বুড়ো মানে আমার দাদুর দেওয়া। বড় হয়ে যখন চোখের বালি পড়েছিলাম আমার মহেন্দ্রর চরিত্র একেবারে ভালো লাগেনি। নিজের বৌ থাকতে তাকে ঠকিয়ে অন্য কারুর সাথে প্রেম। পরকীয়া, আমার ঠিক পছন্দ হয়নি। এর থেকে বিহারীর চরিত্রটা আমার কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। দাদু পরকীয়া করেছে বলেও শুনিনি। দাদুর কি করে পছন্দ হয়েছিল জানিনা। কেননা তিনি তাঁর কোনো কাজের কৈফিয়ত কাউকে দেননি, দেননা।

এই বাড়িতে শুধু আমার নয়, আমার বাবা, কাকা ,আমার বোন, কাকার ছেলে। পিসিদের এমনকি ,মা ,কাকিমা, ঠাকুমা র নাম ওই রবি ঠাকুরের কোনো না কোনো চরিত্রের নামে।বিয়ের পর ঠাকুমার নাম চেঞ্জ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মা কাকিমার বিয়ের আগেই চেঞ্জ করে দিয়েছিলেন। দাদুর দেওয়া নতুন নাম নিয়েই এবাড়িতে এসেছিলেন মা , কাকিমা।

ঠাকুমার কবিতা গান শেষ, এবার মা উঠলো। মা গানটাকে গানের মতোই গায়। তবে তাল অন্য দিক দিয়ে যায়। আচ্ছা যা বলছিলাম – পিসেমশায়, ও তাদের ছেলেমেয়েদের অবশ্য নামকরণ করা যায়নি। তাঁরা তাদের বাবা মায়ের দেওয়া নামেই এখনো পরিচিত। তবে তাদেরকে দাদু যে নাম দিয়েছিলেন এবাড়িতে সেই নামেই তাদেরকে ডাকতে হয়। আর একটা কথা   আচ্ছা আপনারা বসে বসে শুনুন। কেননা বুড়োর অনেক কীর্তি আছে তো শুনে পরে গিয়ে চোট লাগতে পারে।

বুড়োর বাবা মারা যাবার পর বুড়ো সবার নামের পাশাপাশি নিজের নামটাও এফিড ডেফিড করে রবীন্দ্রনাথের কোনো উপন্যাসের চরিত্রের নামে রেখেছেন। তিনি নাকি তাঁর মায়ের নামটাও বদলাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অক্কা যাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। তবে ছেলে নাম বদলাবে বলে ভয়ে অক্কা পেয়েছিলেন কিনা জানি না।

আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমাদের বাড়িতে   ২৫ সে বৈশাখ – রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন , আর ২২ সে শ্রাবন রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন পালিত হয়। ঠাকুমার কাছে শুনেছি আগে বাড়িতেই ছোট করে হতো। রবীন্দ্র নাথের ফটোতে মালা দিয়ে সকালে স্নান সেরে একটু গান আবৃতি হতো। বাড়ির সকলেই করতো এই সব।বাস। তারপর আস্তে আস্তে দাদুর পাগলামি বাড়তে থাকলো। পাড়ার লোককে বলা হতে শুরু হলো। তাদের যারা গান, আবৃতি , নাচ জানে তাদেরকে আসতে বলা শুরু হলো। আমি অবশ্য সেটাই দেখছি। তাদের জন্য লুচি, কুমড়োর তরকারি, রবীন্দ্রনাথ ভালোবাসতেন কিনা জানিনা , দাদু ভালোবাসে। তাই এটা, আর মিষ্টির ব্যাবস্থা থাকতো।

কিন্তু আমি যখন কলেজে পড়তে গেলাম শুনলাম বিশাল ধুমধাম হবে। দাদুর ইচ্ছা রীতিমতো বাইরে প্যান্ডেল করে স্টেজ বানাবেন,সেখানে গান ,নাচ, কবিতা ,আবৃতি করা হবে। আর এবারে নাকি দুপুরেও খাওয়ানো হবে। তবে যারা পার্টিসিপেট করবেন তাঁরা আর তাঁদের বাড়ির লোক খাবেন। বাকিদের শুধুমাত্র মিষ্টি দেওয়া হবে। মেনু – ভাত, ডাল, আলুভাজা, কুমড়োর তরকারি, মাছ, দই । সেই থেকেই চলছে। ২২ সে শ্রাবন মেনুটা একই থাকে তবে যেহেতু দুঃখের ব্যাপার। তাই মাছ বাদ।পের্ ফারমার্স হয়ে গেলে লোকজনকে অভ্যার্থনা জানানোর জন্য আমরা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। এখনো তাই আছি। তবে আমার এখনো পের্ ফর্মেন্স হয় নি। দেরি আছে। মায়ের গান হলো। ডায়লগও দেওয়া হলো। সেটা এমন ” ক্ষমা করবেন , একটু ভুল হয়ে গেলো , আসলে অনেকদিন তো গাইনা” এদিকে ১ মাস আগে থেকে রিহার্সালে বসেবাড়িতে। পাড়ার লোকেও সেটা শুনতে পায়। তবুও মা প্রত্যেক বছর দুই বার করে বলে আর পাড়ার লোকেরাও বলে না না ঠিক আছে। কতসুন্দর গাইলে।

দাদুর অবশ্য তাতে প্রব্লেম নেই, ভালোবেসে মন থেকে গাইতে হবে। সুর মোটামুটি ঠিক থাকলেই হবে। কোনো কায়দা চলবে না।  সেবার ছোট পিসির ছেলে গিটার নিয়ে এলো, সে রবীন্দ্রসংগীত গাইলো – বড় বেশি আধুনিক স্টাইলে। দু কলি শুনেই ধমকে থামিয়ে দিলেন দাদু। । ছোটপিসে ছেলের হয়ে বলেছিলেন বাবা এখন এমন করেই লোকে গাইছে। আপনি যেটা শোনেন ব্যাগ ডেটেড। দাদু ঠাকুর ঘরে গিয়ে গঙ্গা জল এনে জায়গাটা ছিটিয়ে শান্ত গলায় বলেছিলেন – সন্তানদের মধ্যেই বাবা মায়ের গুন্ থাকে , তোমার ছেলেও তাই পেয়েছে। এবার বুঝলাম নলিনাক্ষ (নৌকাডুবির নায়ক) { ছোট পিসির ছেলেকে ওই নামেই ডাকেন } কেন এমন আহাম্মক হয়েছে। এক মিনিট দাঁড়াননি ছোটপিসে। ছোট পিসি, আর ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।আজ পর্যন্ত এই বাড়িতে আর আসেননি। বাপের বাড়িতে একই আসেন ছোট পিসি। তাতে দাদুর কোনো পরিবর্তন নেয়, যেমন গঙ্গা জল ছিটাচ্ছিলেন গোটা বাড়িতে ছেটাতে লাগলেন।

এবার স্টেজে উঠলেন আমার কাকিমা। তিনি নাচ গান দুই করেন। তারপর বোন। সেও নাচ গান দুই করবে।কাকার ছেলে গান আবৃতি তারপর বাবা , কাকা, এক এক করে আবৃতি করবেন তার পর আমি। তারপর পাড়ার ছেলে মেয়েরা। ভুলভাল গাইলেও অসুবিধা নেই, দাদুর কথা হলো বাচ্চা তো। মায়েরাও সব কার ছেলে মেয়ে কত ভালো বলতে পারে তার প্রতিযোগিতা করেন। কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু আমার প্রব্লেম একটাই। আমার এসব বাড়াবাড়ি পছন্দ নয়। তবে আমাকে বাদ দাও না কেন ? তা হবে না। যে বারে চাকরি পেলাম, বললাম আমি থাকতে পারবোনা। ছুটি নেই। আমাকে দাদু জানালো – অমন চাকরির দরকার নেই যারা কবিগুরুকে মান দিতে জানেন না। ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও। আমি এমবিএ করে একটা বিদেশি কোম্পানিতে চাকরি করি তারা কি বুঝবে। বললাম সে কথা। দাদু নিরুত্তাপ গলায় বললো – তাহলে আর বাড়ি ঢুকো না। বাধ্য হয়ে ছুটি নিতে হলো।কেননা সত্যি দরজা খুলবে না।

আমাদের বাড়িতে ছোট থেকেই দেখছি ঠাকুর ঘরে একখানা রবীন্দ্রনাথের ফটো আছে। তাকে অন্য ঠাকুরের মতো নিত্য পুজো করা হয়। বাড়িতে সত্যনারায়ণ, এমনকি লক্ষী পুজো হলেও আগে রবীন্দ্রনাথকে ফুল বেলপাতা দিয়ে দাদু পুজো করেন তার পর বাকি পুজো। দাদু আবার রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মন্ত্রও লিখেছেন। খানিকটা গায়েত্রীমন্ত্র স্টাইলে –

” ওম, রবীন্দ্রনাথায় বিদ্মহে, ভানুসিংহায় ধীমহি
তন্ন রবি প্রচোদয়াৎ ”
ওম রবীন্দ্রনাথও নমো।
পুরোহিত মোসাইকেও নিত্যপুজোতে এই মন্ত্র বলে দুটো ফুল ছুড়ে দিতে হয় রবি ঠাকুরের ফটোতে।

দাদু ব্যাপারটা নিয়ে কিন্তু বিশাল সিরিয়াস। প্রতিদিন সকালে স্নান সেরে ঠাকুরঘরে ঢুকে মন্ত্র বলে পুজো করে তারপর দরকারি কথা বলেন। পৃথিবী ধংস হলেও তিনি মুখ খুলবেন না।

আমি একবার আপত্তি করেছিলাম। আমার যুক্তি ছিল রবীন্দ্রনাথ ব্রাম্ভ ছিলেন তাঁকে এইভাবে পুজো তিনি তো রাগ করবেন। আমাকে দাদু শান্ত, অথচ টিপ্পনি কাটা গলায় উত্তর দিয়েছিলেন – তোমার যে দিন দিন উন্নতি হচ্ছে তাতে আমি খুশি।মানুষ হচ্ছ আস্তে আস্তে। তিনি আমার দেবতা। আমি তাঁকে দেবতা জ্ঞানেই পুজো করি। তিনি ব্রাম্ভ হলেও সব ধর্মকে মানতেন, শ্রদ্ধা করতেন। তুমি কি করে জানবে? আহম্মক।

খুব রাগ হলেও আমি আর কিছু বলিনি। দাদুর বরাবরই আমার উপরে খুব রাগ। কেননা আমাকে তিনি গান শেখাতে চেয়েছিলেন। গানের অনেকগুলো মাস্টারমশাই এসেছিলেন। কিন্তু আমাকে গান করানো দূর গলায় বসাতে পারেননি। কিন্তু হাল ছাড়েননি দাদু। ও পাড়ার গানের মাস্টারমশাই শ্যামবাবুকে ধরে এনেছিলেন। তাতেও লাভ হয়নি। শ্যামবাবু অবশ্য একটু পেটুক মানুষ। তিনি খেতে পেলেই খুশি। ছাত্র কি করলো তাতে এত খেয়াল নেই। একদিন মুখে সিঙ্গারাটা পুড়তে যাবেন লাঠির হাতল করে শ্যামবাবুর হাতটা ধরে দাদু বললেন শ্যাম – আমি দেখছি তোমার গান শেখানোর থেকে খাওয়ায় বেশি মন। আমার আবার খাওয়ানোর থেকে গানে বেশি মন। দেরি করেননি শ্যামবাবু, মাথা নিচু করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। অনেক করেও যখন গান একেবারেই হলো না। দাদু কবিতা শেখালেন। আমাকে এখন অনিচ্ছা স্বত্তেও কবিতা বলতে হয়।

আর আমিই এবাড়িতে একমাত্র যে একটু আধটু দাদুর এইসব পাগলামির প্রতিবাদ করে , যদিও লাভ কিছুই হয় না। শান্ত নির্লিপ্ত গলায় বলেন- শুনেছি,অনেকে ঘর ভাড়া দেয় , অল্প টাকাতে, সেক্ষেত্রে খবর ভালো হয়না,তাতে কি? নিজের মতো বেশ থাকা যায়। চেষ্টা করে দেখতে পারো। মানে ঘুরিয়ে ‘বেরিয়ে যাও”  চলেই যেতাম শুধু বুড়ো বাদে বাড়ির বাকি সবাইকে বড্ডো ভালোবাসি তাই যেতে পারিনি।

প্রিয় বন্ধু মিডিয়ার খবর আরও সহজে হাতের মুঠোয় পেতে যোগ দিন আমাদের যে কোনও এক্সক্লুসিভ সোশ্যাল মিডিয়া গ্রূপে। ক্লিক করুন এখানে – টেলিগ্রাম, হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক গ্রূপ, ট্যুইটার, ইউটিউবফেসবুক পেজ

প্রিয় বন্ধু মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরের নোটিফিকেশন আপনার মোবাইল বা কম্পিউটারের ব্রাউসারে সাথে সাথে পেতে, উপরের পপ-আপে অথবা নীচের বেল আইকনে ক্লিক করে ‘Allow‘ করুন।


আপনার মতামত জানান -

এবার আসি ফাঁসানোর কথায়। এই বাড়িতে প্রেম নিষিদ্ধ। আমার প্রেমের বালাইও নেই। সারাদিন বুড়োকে কি করে শায়েস্তা করবো সেই নিয়েই ভাবি। কিন্তু গতকাল রাত্রে আমার মাথায় বাজ ফেলেছে ওই বুড়ো। ডাক্তার অজিতের ভাগ্নি, খুব ভালো রবীন্দ্র সঙ্গীত গায়, রবীন্দ্রভারটি ইউনিভার্সিটি থেকে এম মিউসিক করেছে। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। তার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে বুড়ো। আজ সে আসবে গান করবে। আর পাকা কথা, আশীর্বাদও হবে আজকেই।

আমাদের বাড়ির বৌ হওয়ায় একমাত্র যোগ্যতা লাগে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে, রবীন্দ্র নৃত্য, বা কবিতা হলেও ভালো তবে না হলেও অসুবিধা নেই। কিন্তু গান গাইতেই হবে মাস্ট।  কালো, ফর্সা, মোটা রোগ, লম্বা,বেঁটে, এসব কিছু ম্যাটার করে না। মা একটু আধটু গাইতে পারতো, অবশ্য সেই তুলনায় কাকিমা ভালো গায়। জামাইদের একটু আধটু কবিতা জানতে হবে – তা জানে পিসেরা।

লাভ হবে না জেনেও আমি তীব্র আপত্তি করলাম। কেননা কাকুর কাউকে একটা পছন্দ ছিল কিন্তু সে গান জানতো না । দাদু না করে দিয়েছিলেন। কাকু দাদুকে ভয় দেখিয়েছিলেন হাতের শিরা কেটে মরবেন। না কোনো প্রভাব পড়েনি। ভাবলেশ মুখে জানিয়েছিলেন – বড় হয়েছো যা ভালো বোঝো করো, তবে এটা ঠাকুরের বাড়ি, পবিত্র স্থান, এখানে ঠাকুর বিরাজ করেন। ওসব রক্ত তক্ত ফেলে এ বাড়ি অপবিত্র করো না। বাড়ির বাইরে গিয়ে যা খুশি করো। না কাকুর মরার সাহস হয়নি। কাকিমাকেই বিয়ে করতে হয়েছিল।

আমার ক্ষেত্রেও যে এসব কাজ করবে না জানতাম। কিন্তু অসম্ভব। দরকার হলে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। তবু বিয়ে করবো না এই মেয়েকে। না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নেই , কিন্তু আর রবীন্দ্র সঙ্গীত নয়, আমি হিন্দি গান, ইংলিশ,বাংলা আধুনিক সিনেমার গান শুনতে বেশি ভালোবাসি। তাছাড়া আমার একটু স্মার্ট মেয়ে পছন্দ।অবশ্য বলছি না যে রবীন্দ্র সঙ্গীত গায় মানেই আনস্মার্ট। কিন্তু দাদুর পছন্দ আমি দেখেছি তো তাই বললাম। আমার মা , কাকিমা আনস্মার্ট খুব একটা নয়, কিন্তু দাদুর ভয়ে কাঁটা, আমার চায় জেদি, যে পাল্লা দিয়ে বুড়োর সাথে লড়বে। চাকরি করা হলেই ভালো। নাহলে এই বুড়োর অত্যাচার সইতে হবে। তীব্র প্রতিবাদ করে বললাম এ বিয়ে আমি করবো না।

বলে দিলাম – দরকার হলে আজকে এখুনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবো। তবু বিয়ে করবো না। তোমার এত পছন্দ হলে তুমি বিয়ে করো।

বুড়ো বললেন – আমি এই বয়সে বিয়ে করলে,তোর বাবাকাকা, ঠাকুমা খুশি হবেন না। অমন মেয়েকে হাতছাড়া করতে চাইনা বলেই তোমার মতো আহাম্মকের সাথে বিয়ে দিচ্ছি। উপায় থাকলে আমিই করতাম বিয়ে। তুমিই ডাক্তার অজিতকে এবাড়িতে এনেছিলে আমি চিনতাম না। তাহলে আপত্তির কিছুই নেই।

আমি বললাম – আছে। আমি বিয়ে করবো না। কিছুতেই না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে সত্যিই চলে যাবো।

আচ্ছা ঠিক আছে। শুনলাম দেখি কি করা যায়। বলে একটু ভেবে ঠাকুমাকে বললেন – আচ্ছা শোনো কালকের জন্য যা যা দরকার এখুনি আলমারি থেকে বের করে নাও। দাদু যা বলে ঠাকুমা কেন? কি কিছুই জিজ্ঞাসা করেন না। আজকেও করলেন না। আমি ভাবলাম যাক কাজ হয়েছে, ফাঁড়া কাটলো।

ডাক্তার অজিত একজন সাইক্রিয়াটিস। বুড়োর পাগলামি দেখে আমি ওনার সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। বুড়ো জানলে আমাকে কেটেই ফেলবে তাই – মিথ্যা করে বলেছিলাম ইনি রবীন্দ্র প্রেমী দাদুর সাথে দেখা করতে চায়। দাদুকে ঠিক করতে গিয়ে নিজে ঠিক হয়ে গেছেন। দাদু তাঁকে নিজের মতো করে নিয়েছেন। আমি বলতে গিয়েছিলাম ডাক্তার অজিতকে তিনি বলেছিলেন, – চিকিৎসা তোমার দাদুর নয়, তোমার দরকার। যারা রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করেন না তারাই অসুস্থ , যেমন তুমি।

খাওয়া দাওয়া হলে – আমাকে দাদু ডাকলেন ঘরে। ঠাকুমা শুয়ে পড়েছে। দাদু বললেন- ওই বালিশের নিচে আলমারির চাবি আছে। চাবিটা নাও , খোলো আলমারিটা, আচ্ছা শোনো লকারটা খুলে লকারে কি আছে বের করে ফের রেখে দাও।  লকারে তেমন কিছুই নেই কত পাস বই,আর কিছু কাগজ। বের করেও রেখে দিলাম। চাবি দিতে গেলাম, দাদু বললেন দরকার নেই রেখে দাও। যাও ঘরে গিয়ে শুয়ে পরো।

আমি ভেবেছিলাম মাথা একেবারেই গেলো নাকি? চলে যাচ্ছিলাম হঠাৎ পিছন থেকে ডাক এলো – আচ্ছা শোনো – আমি ভেবে ঠিক করলাম কালকে পাকা কথার সাথে সাথে আশির্বাদটাও সেরে ফেলবো। কালকে আমার ঠাকুরের জন্মদিন। এর থেকে ভালো দিন আর কিছু নেই।

আমি চমকে বলেছিলাম – মানে? আমি আর এক মুহূর্ত থাকবো না এ বাড়িতে।তুমি শোধরাবে না।

স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে উত্তর এসেছিলো – টাকা চুরি করে পালালে কি হয় জানো ?

আমি – টাকা চুরি মানে?

বুড়ো শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিলো – তুমি আলমারি থেকে ১ লক্ষ টাকা চুরি করে বাড়ি থেকে পালিয়েছো। কাল সকালেই পুলিশে খবর যাবে।তারপর তারা আর তুমি বুঝবে।

আচ্ছা তাহলে আমার ফিঙ্গার প্রিন্ট নেবে বলেই এত কান্ড করলো বুড়ো – মনে হয়েছিল খুন করে ফেলি, কিন্তু সাহসে কুলায়নি।

আজ ২৫ শে বৈশাখ। আলমারি কিন্তু এখনো বন্ধ হয়নি, খোলা আছে। আলমারির বদলে বুড়ো ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে চাবি নিয়ে ঘুরছেন। আর আমি এখানে সেই মেয়ের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। তাকে অনুরোধ করবো সে যেন আমাকে বিয়ে না করে।এই গেলো আমার গল্প। আমি এখনো দাঁড়িয়ে ওদিকে আমার বোন গান শুরু করবে। আমি ওদিকেই দেখছি।

পিছন থেকে মিষ্টি গলায় একটা আওয়াজ এলো – এই যে শুনছেন?

আমি ঘুরে তাকাতেই দেখলাম একটি মেয়ে, দেখতে সুন্দরী বটে, তবে তার থেকেও স্মার্ট। লাল পেড়ে সাদা শাড়ী পরে আছে। আমি ঘুরতেই আমার হাতে তার হাতে থাকা তানপুরা আর ব্যাগটা ধরিয়ে দিলো ।

আমি কোনো প্রতিবাদ না করে ধরলামও।

সে এখন শাড়ীর কুঁচি, চুল ঠিক করছে। আমার হাতে থাকা ব্যাগ থেকে একটা ছোট আয়না, আর লিপস্টিক নিয়ে একবার ঠোঁটে বুলিয়ে নিলো। মুখটা ভালো করে দেখছে। এবার বাগে সেগুলো রেখে বললো আমি এতটাও সুন্দর নয় যে আমার মুখের দিকে এইভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে হবে।

আমি মাথা নিচু করে বললাম – না আমি দেখিনি।

সে বললো – আমার আসতে একটু দেরি হলো। আসলে পার্লারে বড্ডো ভিড়,  মেক আপ করতে দেরি হলো ,বললাম কারণ আমি একটু সাজগোজ করতে ভালোবাসি, কোথাও বের হতে গেলে আমার ১ ঘন্টা সময় লাগে সাজগোছের জন্য। ভবিষ্যতের জন্য ইনফর্মেশনটা দিয়ে রাখলাম। আপনি কি আমার জন্য অনেকেক্ষন অপেক্ষা করছিলেন ?

 

আমি – হ্যাঁ ,মানে না। আপনার জন্য অপেক্ষা করবো কেন? আমি লোকজনকে অভ্যার্থনা জানাচ্ছি এখানে দাঁড়িয়ে।

সে বললো  –  চলুন।

আমি ও মাথা নেড়ে তার সঙ্গে পা বাড়াতে গিয়েও থমকে গিয়ে বললেন – হ্যাঁ , মানে না। আমি যাবো না। আপনি কি অজিতবাবুর ভাগ্নি?

সে বললো – হুম সম্পর্ক তাই বলছে

আমি বললাম – নামটা জানি না , তাই…………….

সে বললো – বিনোদিনী

আমি চমকে বললাম – নামকরণও হয়ে গেলো।

সে বললো – হুম সেই জন্মের পরেই , আপনার বুঝি এখনো হয়নি , তো কি নাম ডাকে লোকজন আপনাকে – বুড়ো খোকা।

আমার নাম মহে…….. বলে চুপ করে গেলাম।

সে বললো – জানি।  মহেন্দ্র।এই যে শুনুন – আপনি মহেন্দ্র আর আমি বিনোদিনী। কিন্তু ‘চোখের বালির ‘ মতো কোনো পরকীয়ার কথা ভাবলেই আচ্ছা করে পেটাবো। আমার সঙ্গে ওসব পরকীয়া চলবে না। বিয়ে করে যা করার তা হবে।

আমি বললাম – মানে আপনি রাজি ?

সে বললো – হ্যাঁ, ভেবে দেখলাম ভ্যাবলা, কাব্ল্যা ছেলেকেই বিয়ে করা ভালো তাতে লাভ বেশি, আমার মতো আমি থাকতে পারবো।

আমি বললাম – মানে আমি ভ্যাবলা, কাব্ল্যা ?

সে বললো – নয়?

আমি বললাম না, মানে হ্যাঁ , মানে না, আমি ভালো ছেলে, তার মানেই ভ্যাবলা, কাব্ল্যা নয়।

সে বললো – দেখেই বোঝা যাচ্ছে ? তা শুনলাম আমাকে ব্যাকি বিয়ের জন্য না বলা হয়েছিল? কেন? হঠাৎ আমার দিকে ঘুরে আমার পাঞ্জাবিটা খিমচে ধরে বললো- আমি কি এতই খারাপ ?

আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম – কি করছেন? ছাড়ুন, লোকে দেখছে ?

সে বললো – ওই জন্যই তো বললাম ভ্যাবলা, কাব্ল্যা। অন্য লোক হলে ঘুরিয়ে জড়িয়ে ধরতো।

আমি বললাম – এখানে , রাস্তায়, আমি ভালো ছেলে। আপনি আমাকে চেনেন না বলে বলছেন।

সে বললো – বেশ চিনি।

আমি বললাম -আপনি আমাকে চেনেন ?

সে বললো -হুম, কদিন ধরে ফলো করেছি, যার সাথে ঘর বাঁধতে যাচ্ছি তাকে একটু বুঝে শুনে নিতে হবে না ।

আমি বললাম  – বলছি নামটা কে দিয়েছিলো ?

সে বললো – দাদু, বাবার বাবা

আর একটা দাদু?একটু আমতা আমতা করে বললাম –  তিনি কি বেঁচে আছেন ?

সে বললো – না। সাথেই বললো -আচ্ছা এবার কি যাওয়া যাবে ভেতরে?

আমি হাটছি তার সাথে। বাধ্য ছেলের মতো। আশ্চর্য ভুলেই গেছি কি বলতে চেয়েছিলাম।

সে হঠাৎ ফের থেমে বললো – আচ্ছা কটা কথা ক্লিয়ার করে নিই। আমি শুধু রবীন্দ্র সঙ্গীত গাই না, সাথেই অন্য গানও গাই , জায়গা বিশেষে। আচ্ছা সিগারেট আর ভদকা,বিয়ার এইসব খাওয়া হয়?

আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বললো  – আমি খাই, মাঝে সাঝে ,একটু আধটু। আমি হা করে তাকিয়ে দেখছিলাম। সে আমাকে মাপতে মাপতে বললো – দাদু ঠিকই বলেছিলো – আমাকেই মানুষ করতে হবে, বড্ড ক্যাবলা।

এদিকেই বুড়ো আসছে। বুড়োকে দেখে বিনোদিনী একটু দেরি হয়ে গেলো , আসলে আসার আগে একবার রেওয়াজ করে এলাম তো তাই। তোমাদের এত বড় অনুষ্ঠান।

দাদু – বেশ করেছো মা। এস।

সে চললো।

আমাকে বুড়ো পকেটে হাত দিয়ে কপি চুপি বললো – আলমারি কিন্তু এখনো খোলা আছে। যাও তানপুরাটা স্টেজে দিয়ে এসো হতভাগা।

আমি রাগ দেখিয়ে যেন মেয়ে পছন্দ নয়, শুধু ব্ল্যাক মেলিং এর ভয়ের জন্য চুপ করে আছি এমন একটা ভাব করলাম। আর মনে মনে বললাম – এই মেয়েই পারবে বুড়ো তোমাকে টাইট দিতে।

বিনোদিনী স্টেজে গান গাইছে — ” আমি তোমার প্রেমে হবো সভার কলঙ্কভাগী ” দাদুর ফেভরিট। চমৎকার গাইছে কিন্তু। নতুন করে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে ইচ্ছা করছে।

 

আপনার মতামত জানান -
Top
error: Content is protected !!