এখন পড়ছেন
হোম > বিশেষ খবর > বাংলার সরকারি কর্মচারীরা আজ যা ভাবেন, রাজনৈতিক মহল তাই ভাবেন কয়েক সপ্তাহ পর

বাংলার সরকারি কর্মচারীরা আজ যা ভাবেন, রাজনৈতিক মহল তাই ভাবেন কয়েক সপ্তাহ পর

বিরোধীদের কলকাতা হাইকোর্টে করা পঞ্চায়েত মামলা আজ এক নতুন মোড় নিল, আদালত আজ স্পষ্ট জানিয়ে দিল আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনে নিরাপত্তার ব্যবস্থা কি করছে রাজ্য সরকার ও রাজ্য নির্বাচন কমিশন তা প্রধান বিচারপতি জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে জানাতে হবে, যদি তা বিচারপতিদের মনে হয় বাস্তবসম্মত, তবেই আগামী ১৪ মে পঞ্চায়েতের জন্য ভোটগ্রহণের জন্য মিলবে ছাড়পত্র। নাহলে, প্রয়োজনে পঞ্চায়েত ভোট পিছিয়েও যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা, কেননা ১৪ মে ভোটগ্রহণের দিনকে আদালত এখন আর ‘ঘোষণা’ বলে মনে করছে না, তা শুধুমাত্র এখন ‘প্রস্তাবের’ পরাজয়ে রইল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা যে একটা বিরাট বড় ইস্যু হতে চলেছে তা প্রায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুরুতেই অনুধাবন করেছিলেন বাংলার সরকারি কর্মচারীরা।

আরো খবর পেতে চোখ রাখুন প্রিয়বন্ধু মিডিয়া-তে

বিজেপি প্রভাবিত সরকারি কর্মচারী পরিষদের আহ্বায়ক দেবাশিস শীল, নির্বাচনের কাজে ভোটকর্মী হিসাবে ব্যবহৃত সরকারি কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে দুই বিজেপি নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার ও কনক দেবনাথকে নিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একদম শুরুতেই ছুটে গিয়েছিলেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনে, দাবি জানিয়েছিলেন কেন্দ্রিয়বাহিনীর তত্বাবধানে সমগ্র নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন দেবাশিসবাবুর যুক্তির সঙ্গে সহমত হলেও, এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয় নি। অনন্যপায় হয়ে দেবাশিসবাবু এরপর কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা করেন। প্রধান বিচারপতি জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য ও বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে তিনি নিজেই জোরালো সওয়াল করেন, যেহেতু সেইসময় আইনজীবীদের কর্মবিরতি চলছিল। রাজ্য সরকারের তরফে সেদিন ডিআইজি অনুজ শর্মা ও রাজ্য নির্বাচন কমিশনের তরফে সচিব নীলাঞ্জন শান্ডিল্য সেদিন উপস্থিত ছিলেন।

তীব্র যুক্তিজালে দেবাশিসবাবু সেদিন দুই বিচারপতির সামনে বলেন, আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনে রাজ্য সরকার যে বাহিনীর কথা বলেছে তাতে দেখা যাচ্ছে এমনিতেই ১০-১২ হাজার বুথে সিভিক ভলান্টিয়ার বা লাঠিধারী পুলিশ থাকবে। তাছাড়াও,ভিআইপিদের প্রহরা ও রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতেও অনেক পুলিশ কর্মীকে ব্যবহার করতে হবে, পঞ্চায়েত নির্বাচন তো থানা খালি করে করা সম্ভব নয়। সবমিলিয়ে নিরপেক্ষভাবে ভোট পরিচালনা করার মত জায়গায় নেই সরকারি কর্মীরা। জবাবে, ডিআইজি অনুজ শর্মা জানান, দেবাশিসবাবু যে তথ্য আদালতের কাছে দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ ভুল, পঞ্চায়েত নির্বাচন সঠিক ও সুরক্ষিত করার জন্য প্রয়োজনীয় বাহিনী দেওয়ার ক্ষমতা রাজ্য সরকারের আছে। সেক্টর অফিসে বাহিনী থাকবে, সেখান থেকে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ঘটলে তা সামাল দিতে প্রয়য়োজনীয় বাহিনী পৌঁছে যাবে। তীব্র প্রতিবাদ করে ওঠেন দেবাশিসবাবু, তিনি বলেন, অনুজবাবুর কথায় আমরা আদৌ আশ্বস্ত হতে পারছি না, ওনার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবের কোনো যোগই নেই। বুথে লাঠিধারী পুলিশ রাখাও যা, না রাখাও তা। আর সেক্টর অফিস থেকে বাহিনী এসে অবস্থা সামাল দেওয়ার আগেই অনেক বড় অঘটন ঘটে যেতে পারে। ঐভাবে নির্বাচন করা যায় না। বুথে বুথে সশস্ত্র বাহিনী না থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব। রাজ্যের ৫৮ হাজার বুথে নির্বাচন পরিচালনা করতে ২ লক্ষ ৯২ হাজার ভোট কর্মী লাগবে, এই তিন লক্ষের কাছাকাছি সরকারি কর্মচারীদের পরিবার আজ ভীত ও সন্ত্রস্ত।

দেবাশিসবাবুর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ডিআইজি অনুজ শর্মাকে বলেন, আপনারা ব্যাপারটা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবুন। সরকারি কর্মচারীদের উপর মানসিক বা শারীরিক – সবরকমের হেনস্থা হয়। কোনো লাঠিধারী পুলিশ দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সশস্ত্র বাহিনী ছাড়া কিভাবে সুরক্ষিত ভাবে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা যাবে? রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা যাঁরা ভোটকর্মী হিসাবে কাজ করবেন, তাঁরা কোনো রাজনৈতিক দলের নন, তাঁদের যথাযথ সুরক্ষার ব্যবস্থা করতেই হবে। কোনোভাবেই তাঁদের সুরক্ষার প্রশ্নে সমঝোতা করা যাবে না। প্রধান বিচারপতি জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য বলেন, রাজ্যের হাতে যদি পর্যাপ্ত বাহিনী থাকে যথাযথ সুরক্ষা দেওয়ার জন্য, তা যেন হলফনামা দিয়ে আদালতকে জানানো হয়। প্রতি বুথে কতজন সশস্ত্র বাহিনী দেওয়া হবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আদালতকে জমা দিতে হবে, সেই তথ্য পাওয়ার পর তবেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ৪ ঠা মে, সে সময়ে এইসব তথ্য আদালতকে জানাতে হবে।

আজকেও বিরোধীদের করা মামলায় বারেবারে ঘুরেফিরে এসেছে সেই নিরাপত্তার প্রশ্নটিই। বিচারপতি সুব্রত তালুকদারও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন নিরাপত্তার ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ প্রধান বিচারপতির কাছে জমা দিতে হবে। তিনি এব্যাপারে সন্তুষ্ট হলে তবেই মিলবে পঞ্চায়েতের ছাড়পত্র। আর তাই বিচারপতি তালুকদারের এহেন রায়ের পরে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলতে শুরু করেছেন, বাংলার সরকারি কর্মচারীরা আজ যা ভাবেন, রাজনৈতিক মহল তাই ভাবেন কয়েক সপ্তাহ পর। বিজেপি প্রভাবিত সরকারি কর্মচারী পরিষদের আহ্বায়ক দেবাশিস শীল যে ইস্যুতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুরু থেকে লড়াই করে যাচ্ছেন, সমগ্র রাজনৈতিক মহল সেই একই দাবিতে এসে আজ মিলে গেল। আর তাই আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন তো বটেই রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের উপস্থিতি ও মতাদর্শগত অবস্থান একটা বড় রকমের ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’ হতে চলেছে।

আপনার মতামত জানান -
Top
error: Content is protected !!