এখন পড়ছেন
হোম > রাজ্য > কলকাতা > শাশ্বত ঘোষ – আপনার সাহসে ভরা দুটি প্রশ্নের উপরে চিরকৃতজ্ঞ থাকবেন আপামর শিক্ষককুল

শাশ্বত ঘোষ – আপনার সাহসে ভরা দুটি প্রশ্নের উপরে চিরকৃতজ্ঞ থাকবেন আপামর শিক্ষককুল

পোয়েটিক জাস্টিস? নাকি, আশ্চর্য সমাপতন? ঠিক কোন ভাষায় ব্যাখ্যা করব খুঁজে পাচ্ছি না! সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে ‘শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চের’ অভিভাবকত্বে এক মামলায় বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এক ঐতিহাসিক রায়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাজ্যের হাজার হাজার প্রাথমিক শিক্ষকদের দিয়ে ২ মাস ধরে যে ডিও, বিএলও বা সুপারভাইজারের ডিউটি করানো হচ্ছে সেই নির্দেশিকা আইনানুগ হয় নি – ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই কাজ করতে আর বাধ্য নন তাঁরা। এতদিন ধরে যে ‘মুক্তির’ পথ খুঁজছিলেন রাজ্যের আপামর প্রাথমিক শিক্ষক – এই রায়ের ফলে সেই রাস্তা অবশেষে মিলল।

কিন্তু, কেন এই মামলা? আর কেনই বা ডিও, বিএলও বা সুপারভাইজারের ডিউটি থেকে ‘মুক্তি’ খুঁজছিলেন রাজ্যের হাজার হাজার প্রাথমিক শিক্ষক? সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কিছুটা। এমনিতেই, বর্তমান শিক্ষা-ব্যবস্থায় নিজেদের শিক্ষা-প্রদানকারী বলার থেকে ছোটোখাটো ‘রেশন-দোকানের কর্মচারী’ বলে দুঃখপ্রকাশ করেন প্রাথমিক শিক্ষকরা। শিক্ষকের প্রাথমিক যে কাজ সেই ‘শিক্ষাদানের অঙ্গীকারকে’ আপাতত মাথায় তুলে, বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষকদের যা করতে হয় তার ছোটোখাটো তালিকাটি হল – জুতো, ব্যাগ, সাইকেল, স্কুলড্রেস প্রদান, রূপশ্রী, কন্যাশ্রীর ঝক্কি পোয়ানো, মিড-ডে মিলের হিসাব রক্ষা থেকে শুরু করে তার বাজার করা, রুবেলা টিকা দেওয়া, আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ানো ইত্যাদি প্রভৃতি।

এই তালিকা যদি লিখতে থাকি, তাহলে বোধহয় পুরো একটি রিপোর্ট ওই তালিকা দিয়েই সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। একটি সূত্র থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী – বর্তমানে রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষকদের মোট ২৬ রকমের শিক্ষা-বহির্ভূত কাজ করতে হয়! তাঁদের বর্তমান বেতনের কথা না হয় বাদ দেওয়া গেল, বাদ দেওয়া গেল কেন্দ্রীয়হারে বেতন বা ডিএ না পাওয়ার করুণ অধ্যায়। কিন্তু, ‘ছাই ফেলতে ভাঙা কুলোর’ মত রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষকদের ওই ২৬ রকমের শিক্ষা-বহির্ভূত কাজ করতে যে ‘দক্ষিনা’ দেওয়া হয় – লজ্জায় মুখ ফুটে তাঁরা তা বলতেও পারেন না কোথাও। কেননা, তাঁদেরই কথা অনুযায়ী – বাড়িতে একজন দিনমজুর লাগালে যে টাকা দৈনিক ভাতা হিসাবে দিতে হয় বা ১০০ দিনের কাজে মাটি কেটে একজন যে টাকা দৈনিক ভাতা হিসাবে উপার্জন করেন, এইসব কাজের জন্য তার ১০-১২ ভাগের একভাগও জোটে কিনা সন্দেহ!

ফেসবুকের কিছু টেকনিকাল প্রবলেমের জন্য সব খবর আপনাদের কাছে পৌঁছেছে না – তাই আরো খবর পেতে চোখ রাখুন প্রিয়বন্ধু মিডিয়া-তে

এবার থেকে প্রিয় বন্ধুর খবর পড়া আরো সহজ, আমাদের সব খবর সারাদিন হাতের মুঠোয় পেতে যোগ দিন আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রূপে – ক্লিক করুন এই লিঙ্কে

আর এই শিক্ষা-বহির্ভূত কাজের তালিকায় আরেকটি গুরুদায়িত্ত্ব ডিও, বিএলও বা সুপারভাইজারের ডিউটি। কোন বড়সড় নির্বাচন সামনে এলেই এই দায়িত্ত্বটি ‘টুক করে’ কোথা থেকে এসে অর্পিত হয় রাজ্যের শিক্ষক মহাশয়দের উপরে। আর তাই, পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরী করা মাথায় তুলে রেখে ‘গণতন্ত্র রক্ষার’ মহান দায়িত্ত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় তাঁদের। এতদিন যাবৎ, এই কাজটি সপ্তাহ দুয়েক করতে হত স্কুলের পড়ানোর পাশাপাশি এবং সাকুল্যে দক্ষিনা জুটত ৫০০-৭০০ টাকা। এবছর তা হঠাৎ করে বেড়ে ৬১ দিন হয়ে গেল এবং তার জন্য দক্ষিনা কি জুটবে তাও স্পষ্ট নয়।

এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ শে আগস্ট নদীয়ার নাকাশিপাড়া বিডিও অফিসে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ডিও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। সেইমত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বিডিও অফিসে গিয়ে সই করে নির্ধারিত ফাইলটি তুলে ট্রেনিং রুমে যান। সেখানে ঘন্টা দুয়েক ধরে ট্রেনিং চলা শেষ হলে ট্রেনিং নেওয়া দুই আধিকারিক শিক্ষকদের কাছে জানতে চান তাঁদের কোনো প্রশ্ন আছে কিনা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে, উপস্থিত শিক্ষকদের এবং তার বাইরেও রাজ্যের অনেক শিক্ষকেরই মনের কথা তুলে ধরতে, অত্যন্ত সাহসে ভর করে তাঁদের দুটি প্রশ্ন করেন – তরুণ শিক্ষক শাশ্বত ঘোষ, যা পরবর্তীকালে ইতিহাস তৈরী করে দিল রাজ্যের বুকে।

শাশ্বতবাবু সেদিন আধিকারিকদের প্রশ্ন করেছিলেন – এক, এই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ সাধারণত ১৫ দিন ধরে চলে, কিন্তু এবছর তা হতে চলেছে দুমাস ধরে। তারমধ্যে পুজোর ছুটিও পড়ছে – কি পরিস্থিতিতে এতদিন ধরে এই কাজ চলছে? এবং দুই, এই দুমাস ধরে যে কাজ করতে হবে – তার জন্য আমাদের প্রাপ্য কি হবে? যাঁরা ‘ট্রেনিং’ দিতে এসেছিলেন – এই সাধারণ প্রশ্নের উত্তর তাঁদের কাছে ছিল না আর তারফলে, উপস্থিত শিক্ষকদের বয়ান অনুযায়ী, তাঁরা চেয়ার ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে রীতিমত উষ্মাপ্রকাশ করেন শাশ্বতবাবুর উপর। ভাবুন একবার!

মাচপোতা প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শিক্ষক শাশ্বত ঘোষ।

আর এরপর আসরে অবতীর্ন হন স্বয়ং বিডিও সাহেব। তিনি পুনরায় শাশ্বতবাবুর কাছ থেকে জানতে চান কি তার জিজ্ঞাস্য, শাশ্বতবাবু আবারো করেন সেই দুই মোক্ষম প্রশ্ন। কিন্তু বিডিও সাহেবের কাছেও দুর্ভাগ্যবশত ছিল না সেই প্রশ্নের উত্তর। আর তাই তিনি ক্ষমতার দম্ভে জানিয়ে দেন ‘বাই হুইপ’ নাকি এই কাজ করতে বাধ্য রাজ্যের শিক্ষকরা! মানে একটু ধার করে বলতে হয় – প্রশ্ন কোরো না, ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন! তবে সেদিনের ঘটনা শুধুমাত্র সেই প্রশ্নোত্তর পর্বেই থেমে ছিল না – একজন প্রাথমিক শিক্ষক হিসাবে একজন প্রশাসনিক কর্তাকে প্রশ্ন করছেন শাশ্বতবাবু – কতবড় দুঃসাহস! তাও আবার এমন প্রশ্ন যার উত্তর তিনি জানেন না অথচ জানা উচিত ছিল – সুতরাং এরপর নিজের ‘সাঙ্গপাঙ্গদের’ নিয়ে শুরু হয় হুমকি!

‘সাসপেন্ড’ করার হুমকি দিয়ে নিজের ‘কর্তব্য’ শুরু করেছিলেন মহামান্য বিডিও সাহেব। এরপরে এসআই, ডিআই, চেয়ারম্যানকে দিয়ে শোকজ করানো, সেই চিঠির বয়ানে ‘অসত্য-ভাষণ’, এমনকি শোকজের জবাব দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের আগেই চেয়ারম্যানকে দিয়ে শাশ্বতবাবুকে ‘শুনানিতে’ ডেকে পাঠানো – নিজের ‘প্রশাসনিক দায়িত্ত্ব’ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করে গেলেন বিডিও-সাহেব। এতে শাশ্বতবাবুকে ‘সাসপেন্ড’ করা না গেলেও, এমনকি ‘সাসপেন্ড করানোর’ ভয় পাওয়ানো না গেলেও – যে কাজের কাজটি হল – তা হল শিক্ষকমহলের এতদিনের ক্ষোভের সুপ্ত আগ্নেয়গিরিতে লাভাস্রোতটি বেরিয়ে এল। ‘ভিসুভিয়াস’ যখন জাগল – তখন তো ‘মহাপ্রলয়’ হবেই।

আর হলও তাই! ‘অনেক হয়েছে’ বা অনেক কেটেছে ‘অপমানের প্রহর’ এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শাশ্বতবাবু পাশে পেলেন প্রতিবাদী শিক্ষক মইদুল ইসলাম ও তাঁর সংগঠন ‘শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চকে’। শাশ্বতবাবুকে যাতে কোনো আইনি সমস্যায় না পড়তে হয় বা সাসপেন্ড না হতে হয় তার ব্যবস্থা পাকা করে ছুটলেন তাঁরা প্রখ্যাত আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের কাছে। সবশুনে বিকাশবাবু ও তাঁর সুযোগ্য সহকারী ফিরদৌস শামিম আইনের পাতা ঘেঁটে বার করলেন – সুপ্রিম কোর্টের নিয়ম এবং বিভিন্ন ‘রায়’ বলছে এই নির্দেশিকা সম্পূর্ণ বেআইনি। ‘বাই হুইপ’ তো অত্যন্ত দূরের কথা এই কাজ করতে আদতে বাধ্যই নন শিক্ষকরা, এমনকি এই কাজ এইভাবে শিক্ষকদের দিয়ে প্রথমেই কোনো ছুটি না দিয়ে সরাসরি করানোও যাবে না!

তীব্র-ব্যাঙ্গে ভরা শিক্ষকদের প্রতিবাদে আঁকা কার্টুন – যা এখন বুকে লাগিয়ে ঘুরছেন প্রতিবাদী শিক্ষকরা।

আর তারপরে শুরু হল আদালতে আইনি যুদ্ধের খেলা। আইনজীবী শামিম সাহেবের যুক্তির সামনে দাঁড়িয়ে – সরকারি পক্ষের সওয়াল দাঁড়াল – গণতন্ত্রের স্বার্থে, দেশের জন্য কিছু কাজ করতে হয় (যেন গণতন্ত্র রক্ষার একক দায় শুধুমাত্র শিক্ষকদের এবং তার বিনিময়ে বহু প্রশাসনিক-কর্তার কাছ থেকে অপমানজনক কটূক্তিই প্রাপ্য)! সেদিনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল চিত্রটা – এবার বোধহয় মিলতে চলেছে মুক্তি! কিন্তু, বন্ধের দোহাই দিয়ে পিছল রায়দান – আর তারপরেই ২৮ শে সেপ্টেম্বর অবশেষে সামনে এল সেই ঐতিহাসিক রায় – যা প্রাথমিক শিক্ষকদের অনেক যন্ত্রনা থেকে দিতে চলেছে মুক্তি!

২৮ শে আগস্ট যে ‘যুদ্ধ’ শুরু হয়েছিল – ‘আশ্চর্য সমাপতন’ ঘটিয়ে পরের মাসের ২৮ তারিখ হল তার ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’, মিলল ‘পোয়েটিক জাস্টিস’। আর তাই, শাশ্বতবাবু – আপনার সাহসে ভর করা দুটি প্রশ্নের উপর চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকবেন আপামর শিক্ষককুল। সেদিন আপনি ওই দুটি প্রশ্ন মুখ ফুটে না করলে – বোধহয় বঙ্গের বুকে শিক্ষকদের জন্য এই ‘ইতিহাস’ রচিত হত না। তবে, শেষ করার আগে আরেকটি কথা – কলকাতা হাইকোর্টে রায়দান হয়ে গেলেও সেই রায়ের কপি এখনো নির্দিষ্ট জায়গায় না পৌঁছানোয়, এখনও শিক্ষকদের দিয়ে এই ডিও, বিএলও বা সুপারভাইজারের ডিউটি করানো হচ্ছে – তবে যাঁরা এতদিন ‘দম্ভভরে হুইপ জারি’ করেছিলেন, তাঁদের গলায় এখন কাজটি ‘তুলে দেবার’ জন্য কাতর অনুনয় শোনা যাচ্ছে!

আপনার মতামত জানান -
Top
error: Content is protected !!