এখন পড়ছেন
হোম > অন্যান্য > বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ১১

বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ১১

নীরার খবর কি ? নীরার মনে কি চলছে ? হ্যাঁ খুব কষ্ট হচ্ছে ? কিন্তু কিসের? অবিনাশ না করে দিয়েছে বলে ? নাকি অন্য কিছু যার খবর নীরা জেনেও জানতে চায় না। খুব কষ্ট হচ্ছে নীরার ? কিন্তু অবিনাশের জন্য নয়, যতবার মনে করছে অবিনাশের কথা, ততবারই মনে হচ্ছে কোথায় মিল ছিল নীরার সাথে অবিনাশের ? ইরা ঠিকই বলতো।মুখে না মানলেও ধ্রুব ওর জীবনে আসার পর থেকে বেশ বুঝতে পারছিলো নীরা। জোর করে চাপা দিতে চাইছিলো। অবিনাশের কথা ভাবলেও বার বার তুলনায় চলে আসছিলো ধ্রুব নীরার অজান্তেই। জোর করে নীরা আসতে দিচ্ছিলো না ধ্রুবকে। নীরাকে অবিনাশের বাড়িয়ে লোক না করে দিয়েছে, কালো বলে.সেই কথাটা কষ্ট হচ্ছে নীরার। ” বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা ” এই কথাটা কষ্ট দিচ্ছে , বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে কষ্ট হচ্ছে , বাবা যদি সামলাতে না পারে সেটা নিয়ে কষ্ট হচ্ছে। চিন্তা হচ্ছে, ভয় করছে। পাড়া প্রতিবেশিদের টিটকিরি ,সেই নিয়ে কষ্ট হচ্ছে। এত অপমান সহ্য হচ্ছে না নীরার।

 

অবিনাশ যদি ওর জীবন থেকে চলে যায় তাহলে নীরা ভেবেছিলো সে মরে যাবে কিন্তু তেমন তো কিছু হয়নি। কেউ ছিল না নীরার জীবনে। অনেকে না করেছে, সেখানে অবিনাশ হ্যাঁ বলেছিলো তাই নীরা ওকেই আঁকড়ে ধরেছিলো। মনে হয়েছিল ওর মনের মধ্যে যে রাজপুত্রগুলো আছে , যারা তার লেখা গল্পে তার নানা রূপের সাথে প্রেম করে, ভালোবাসে তারা বোধ হয় শুধু তার মনের চিলেকোঠাতেই থাকে, বাস্তবে থাকে না। কিন্তু ধ্রুবকে যত দেখেছে মনে হয়েছে কেউ যেন তার মনের কোন থেকে তার মনের মানুষের ছবিটা চুরি করে তাকে মন প্রাণ দিয়ে তার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। জোর করে ঢুকতে দেয়নি নীরা। কি করে দেবে ? সে মধ্যবিত্ত সাধারণ মেয়ে, বিয়ে ঠিক হয়েছে এত কান্ড করে, সেই বিয়ে ভেঙে কি করে নিজেকে ধ্রুবর কাছে মেলে ধরবে? লোকে কি বলবে? তাছাড়া ধ্রুব ওর মতো একটা শ্যামলা মেয়েকে ভালোবাসতে পারে কি? চোখ বুঝলো দু গাল বেয়ে জল পড়ছে। ধ্রুবযেদিন চলে গেলো নীরার মনে হয়েছে সব হারিয়ে ফেলেছে ও। ফাঁকা লেগেছে চারপাশটা। আচ্ছা সেদিন কি বলতে চেয়েছিলো ধ্রুব ? ভয়ে কথা ঘুরিয়ে না দিয়ে শুনলেই হতো। যদি সত্যিই বলতো ধ্রুব ওকে ভালোবাসে ধ্রুব? তাতেই কি করতো নীরা ? বিয়ে ভাঙার ক্ষমতা ছিল নীরার? আচ্ছা ধ্রুব জানে নিশ্চই , আসবে না ও? আমাকে একবার দেখতে আসবে না। অনেক কিছু টানাপোড়েন চলছে নীরার মনের মধ্যে।

ইরা অনেকবার করেছে ধ্রুবদার কথা শুনলেই নীরার মুখটা অন্যরকম হয়ে যায়। তবে ভালোবাসে কি? ঠিক বুঝতে পারে না ইরা। না মনে হয়।

ইরার রাগ হচ্ছে ধ্রুবর উপর, কি করে বোঝাবে ধ্রুবদাকে দিদির অবিনাশকে ভুলতে আর ধ্রুবদাকে ভালো বসতে বেশি সময় লাগবে না দিদির। অমন একটা ছাগলকে ভালোবাসলে ধ্রুবদাকে ভালোবাসতে দু দিন লাগবে , উফফ কি যে করে ইরা ?

বাবাকে বলবে। না বাবা বুঝবে না। মা – মা বললেও যদি ধ্রুবদা না করে দেয় সেটা আরো খারাপ হবে। তবে প্রকাশদা , প্রকাশদাকেই সব কথা বলবে ইরা। তারপর যা হবার হবে।

সকালে ইরা সীমাদের বাড়িতে যাচ্ছিলো। দেখলো বাইক নিয়ে বেরোতে যাচ্ছে প্রকাশ , ইরা বললো – তোমার সাথে একটা জরুরি দরকার আছে।
প্রকাশ- বল।
ইরা – এখানে বলা যাবে না। উপরে চলো।
প্রকাশ – কি হয়েছে ?
ইরা – কথাটা ধ্রুবদাকে নিয়ে।  ধ্রুবদাকে একবার আসতে বলো না।
প্রকাশের রাগ হলো। সে ভেবেছিলো নীরার বিয়ে হয়ে গেলেও ইরার সাথে ধ্রুবর সঙ্গে বিয়ের কথা বলবে কিন্তু এখন এই অবস্থায় কোন মুখে বলবে? রাগ হলো প্রকাশের। বাড়ির এই অবস্থা ,আর এখন তিনি প্রেমিকের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদবেন। সত্যি কি স্বার্থপর আজকালকার ছেলেমেয়েরা। মুখে বললো – সে এসে কি করবে ?
ইরা – তুমি ওপরে চল না আমি বলছি। এখানে বলা যাবে না।

 

ওপরে এলো। সীমাকেও ডাকলো প্রকাশ। সোফায় বসলো। প্রকাশ বললো – বল
ইরা – ধ্রুবদাকে আসতে বলো না, তোমরা বললে আসবে।
প্রকাশ – কি করবে সে এসে?
ইরা একটু ইতস্তত করে – ধ্রুবদা দিদিকে ভালোবাসে।
প্রকাশ – কি?…………………
সীমা – ভাই, নীরাকে ?
প্রকাশ – তোকে কে বললো ?
ইরা – ধ্রুবদাকে দেখে তোমরা কিছু আন্দাজ করো নি।
সীমা – না কিছু তো হয়নি।
প্রকাশ- করেছি, আমি ভেবেছিলাম তোর কথা , নীরা বলে বুঝতে পারিনি।একটু ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবি। তোকে কে বললো, ধ্রুব।

ইরা এইবার প্রথম থেকে সব কথা , তাকিয়ে থাকা থেকে শুরু করে জড়িয়ে ধরা, ফোনে ছবি,  প্রপোজ করতে যাওয়া সব ,এমনকি সেদিন যে ইরা এসেছিলো ইরার কাছে ধরা পরে গিয়েছিলো ধ্রুব সেটাও বললো।

সীমার মুখটা হা হয়ে গেলো। কি বলছিস? এত কিছু ঘটে গেলো আর আমরা কিছু বুঝতে পারলাম না। প্রকাশকে বললো এই তুমি আমাকে তো কিছু বোলো নি।

প্রকাশ বললো দাড়াও মালটাকে দেখছি। আসতে বলছি,।

ইরা বললো কিন্তু প্রব্লেম হলো কিছুতেই স্বীকার করছে না যে। আমার কাছে ধরা পরে গেছে। ওর ধারণা দিদি অবিনাশকে ভালোবাসে তাই দিদির জীবন থেকে সরে যাচ্ছে।

প্রকাশ বললো – যাওয়াচ্ছি। কি করা যায়?

প্রকাশ বললো – আসতে বললেই কি আসবে? আনতে হবে। ভাবতে ভাবতে বললো সীমা……………………র শরীর খারাপ বললে , হুম তাতেও অধিবিধা সীমার বাড়ির লোকজন আসবে খবর পেয়ে।তাছাড়া তাতে তো বলবে না যে ও নীরাকে ভালোবাসে, কি করা যায়।

সীমা বললো – যদি বলা হয় নীরার খুব শরীর খারাপ ?
প্রকাশ – হবে কিন্তু আসবে কিনা সিওর না, এলেও দেখবে নীরা ঠিক আছে মুখ খুলবে না।
ফের ভাবতে বসলো সকলে। ইরার একটা মস্ত বড় গুণ,মোক্ষম সময়ে মোক্ষম মোক্ষম আইডিয়া মাথায় আসে।দিদি সুইসাইড করেছে।
সীমা – কি? এমা ছি ছি,  না।
প্রকাশ – আইডিয়াটা খারাপ নয়, তবে সুইসাইড করেছে নয়, করতে গিয়েছিলো।
সীমা – এই দেখো এই সব অলুক্ষণে কথা বলতে নেই বোলো না।
প্রকাশ  – চুপ করো তো। ভালো কাজে একটু আধটু মিথ্যা চলে। কি বলিস।
ইরা – মাথা নেড়ে বললো হুম
প্রকাশ – কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তোদের বাড়িতে যদি ফোন করে জানতে চায় ।
ইরা – দূর -আমাদের বাড়ির ফোন নম্বর কোথায় পাবে? আমার ফোন নম্বর আছে ধুবদার কাছে। তবে সেদিন দিদিকে যখন আনতে যাচ্ছিলো ধ্রুবদা আমি দিদির নম্বরটা ম্যাসাজ করে দিয়েছিলাম। দেখেছে কি না জানি না।

প্রকাশ – হুম, তুই এক কাজ কর। কত বাজে , ১০ টা ১৫। তুই নীরার ফোনটা সুইচ অফ করে লুকিয়ে রেখে এখানে চলে আয়। আর শোন্ কুঁড়িকে তোদের বাড়ি রেখে দিয়ে আয়। নীরার জিম্মায়।
ইরা – আচ্ছা।

কুঁড়ি এখানে ছিল না। সে তার ঘরে খেলা করছিলো। ইরা ওকে নিয়ে চলে গেলো। ১০ মিনিট বাদেই ফিরে এলো। প্রকাশ, সীমা তখন সোফায় বসে।
প্রকাশ বললো – নে ধ্রুবকে ফোন করে কাঁদো কাঁদো গলায় বল- দিদি সুইসাইড করতে গিয়েছিলো , বলে ফোনটা কেটে দে , আর ধরবি না।

সীমা – এই দেখো ভাই এমনিতে ভালো মানুষ। কিন্তু রেগে গেলে খুব খারাপ। যখন জানতে পারবে সব মিথ্যা। কি হবে বুঝতে পারছো না।

প্রকাশ – টেনশন হচ্ছে।? ফোনটা বাড়িতে রেখে নীরাদের বাড়ি চলে যাও। আর শুভ কাজে বাধা দিয়ো না।

সীমা – তুমি বুঝতে পারছো না। আমি কথা বলছি ভাইয়ের সঙ্গে।

প্রকাশ – চুপ করো তো , ব্যাটা প্রেম করবে , আর মুখে বলতে কষ্ট। আমি দেখে নেবো,কি করবে দেখছি। ইরার দিকে তাকিয়ে বললো কর ফোন। তারপরেই বললো -দাঁড়া , দাঁড়া। একবার বলতো।

ইরা সুন্দর করে বললো। প্রকাশ বললো পারফেক্ট।

ইরা ঠাকুর প্রণাম করে কল করলো – কয়েকবার বাজতেই ফোন তুললো ধ্রুব। বললো বল।

ইরা – ধ্রুবদা, সর্বনাশ হয়ে গেছে, দিদি সুইসাইড করতে গিয়েছিলো। ওপার থেকে একটা ভয়, কষ্ট উদ্বিগ্ন জড়ানো গলায় আর্তনাদ ভেসে এলো- কি? কি কি করেছে নীরা ? কেমন আছে ?

প্রকাশ ইরাকে ইশারা করলো ফোনটা কেটে দেবার জন্য। ইরা ফোন কেটে দিলো।
সঙ্গে সঙ্গেই ফোন বেজে উঠলো। কেউ ধরলো না। ফোন সাইলেন্ট করে দিলো। প্রকাশ আর সীমা ওদের ফোন দুটো কাছেই ছিল। কয়েকবার ইরার ফোনে ফোন এলো। কেউ ধরলো না। এবার ফোন এলো প্রকাশের ফোনে।

সে ফোন ও ধরলো না কেউ , সীমাও তার ফোন ধরলো না। সীমা বললো ছি ছি ছেলেটাকে ফালতু টেমশন দিচ্ছ।
মুখ বেকালো ইরা ?
ইরার টেনশন হচ্ছে – এত করেও শেষ রক্ষা হবে। আসবে তো? বলবে তো ?

প্রকাশ বললো – তোর কথা যদি সত্যি হয়, যদি নীরাকে ও ভালোবেসে থাকে তাহলে আসবেই। আর মুখও খুলবে।

ফের প্রকাশের ফোন বেজে উঠলো। প্রকাশ ফোন তুলে বললো – ধ্রুব ,খুব ব্যাস্ত আছি , পরে কথা বলছি। কেটে দিলো।

সীমাকে ফের কল করলো – প্রকাশ বললো। এমন ভান করো কাকিমা কাঁদছেন তাকে চুপ করাচ্ছ। আর তুমি ওকে বলো পরে কথা বলছি।
সীমা ভয়ে ভয়ে ফোন তুললেও কথাটা ঠিক প্রকাশ যেমন শিখিয়ে দিয়েছিলো তেমনি বললো।

 

আগের পর্ব – বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ১০

 

 

 

পরের পর্ব – বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ১২

 

আপনার মতামত জানান -
Top
error: Content is protected !!