এখন পড়ছেন
হোম > অন্যান্য > বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ৬

বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ৬

ধ্রুবর মনে খটকা , কি করে সব জানলো ইরা ? এইভাবেই গল্পটা শেষ হবে। না ওকে ধরতেই হবে। কিছু তো রহস্য আছে ! এই সব ভাবনার মধ্যেই কখন যে ৫ টা বেজে গেছে খেয়াল করে নি ধ্রুব। পিছন থেকে ডাক এলো -মামা চলো আমরা পার্কে ঘুরতে যাবো। কুঁড়ি ডাক দিলো। অন্যদিন সোমেস্বরবাবু, কিংবা ইরা,নীরা ও সীমাদের সাথে যায়  আজ মামার সাথে যাবে। একটু দূরেই একটা পার্ক আছে। ছোটোখাটোর উপরে বেশ ভালো। আসার সময় দেখেছে ধ্রুব। নামটা অতো মনে নেই। বললো – বেশ -চলুন ম্যাডাম, ঘুরে আসি। সীমাকে বললো দিদি তুই যাবি। সীমা বললো না।

 

নিচে নেমে বাইরে বেরোলেই একটা রাস্তা। আর ওপারেই নীরাদের বাড়ি। নীরাদের বাড়ির সামনে একটু দাঁড়ালো।কুঁড়ি বললো চলো না এখানে কি করছো?দেরি হয়ে গেলো তো। আমার বন্ধুরা সব খেলা শুরু করে দিলো। ধ্রুব বললো হুম , চল। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ধ্রুবর মনে হচ্ছিলো এখনই আছে সেই মুখটা। আজ একবারও দেখতে পায়নি। এতক্ষন নিশ্চই বাড়ি এসে গেছে। একবার যদি এখন দেখতে পেতো। ভাবতে ভাবতেই দুজনে হাটতে হাটতে পার্কে গেলো।  নামটা দেখা হয়নি। এবার দেখলো,জোর ঝাটকা। পার্কের নাম ‘নিরালা’ কি হচ্ছে এইসব। নিরা ……. লা,সবটাই কাকতালীয়? ইতিমধ্যে কুঁড়ি নিজের সঙ্গী সাথীদের সাথে খেলতে লেগে গেছে। মাথার মধ্যে অনেক কিছু ঘুরছে। কিন্তু হিসাব মেলাতে পারছে না। একটা সাধারণ শ্যামবর্ণ মেয়ে। এমন অসাধারণ সুন্দরী নয়, চুপচাপ , ইরার মতো নয় যে খোলা মেলা যে নিজেকে মেলে ধরে। তার জন্য রাতের ঘুম কি করে উড়লো ধ্রুবর,  মাথায় ঢুকছে না। ইরার সঙ্গে অনেকবার দেখা হলো। এমন ভাবে মিশছে যেন কতদিনের চেনা খুব মিষ্টি স্বভাব। প্রেমে পড়া যায় চট করেই কিন্তু তাকে নিয়ে তো একবারও কিছু মনে হয়নি ধ্রুর। অথচ ওই চোখ দুটো। কোনো কথা না বলেও শুধু “আসছি” বলেই পাগল করে দিয়েছে ধ্রুবকে। নিজেকে মনে মনে শাসন করে বললো অনেক হয়েছে ,আর ভাববে না। দু দিন পরেই অন্য একজনের বৌ হচ্ছে যে তাকে নিয়ে আর কোনো মতেই এইসব ভাববে না।

 

ঠিক করলো ঝোঁকের মাথায় নীরার যে ফটোগুলো সেভ করে রেখেছিলো সেগুলোও ডিলিট করে দেবে। জোর করে দুটো পিকচার ডিলিট করলেও ওই লাল পেড়ে সাদা শাড়ী পরে সিঁদুরমাখা ছবিটা ডিলিট করতে পারলো না। পকেটে ফোন রেখে দিলো। এইসব আগে ওর পাগলামি মনে হতো। কিন্তু এখন নিজে। এদিকে খুব মেঘ করেছে। দেখতে দেখতে ঝড় শুরু হলো। কুঁড়িকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো ধ্রুব। কিছুক্ষন পর ভীষণ ঝড় আর বৃষ্টি শুরু হলো। প্রচন্ড ঝড় , কারেন্ট অফ। যখন ঝড় থামলো তখন ৮ টা বেজে গেছে, রাস্তাঘাট সুনসান। এমন সময় দরজায় বেল বাজলো। কুঁড়ি বললো বাবা এসেছে। সীমা বললো ওর আসতে দেরি হবে বলেই ছিল।অন্য কেউ। সীমা দরজা খুলে দেখলো ইরা। মুখে একরাশ চিন্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে ? সীমাকে দেখেই জিজ্ঞাসা করলো, দাদাভাই আছে ?

সীমা – না।

ইরা – তাহলে কি হবে ?

সীমা জানতে চাইলো – কিসের কি হবে ? কি হয়েছে?।

ইরা গম্ভীর হয়ে বললো – দিদি ফোন করেছিল  লাইনের উপর গাছ পড়েছে ইসানপুর আর সাবিবপুরের মাঝে, ট্রেন চলছে না। ইসানপুরে ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে।বাবাও বাড়ি নেই। প্রবীরদাদের বাড়ি গিয়েছিলাম, প্রবীরদার খুব জ্বর, উঠতে পারছে না। দিদি বাড়ি আসবে কি করে এত রাতে। প্রবীর পাড়ার ছেলে। নীরার বাবার কাছে পড়েছে। এদের বিপদে আপদে সাহায্য করে।

নীরা বাড়ি আসেনি ? উত্তেজিত হয়ে বললো ধ্রুব।

ইরা জানালো না। আগের ট্রেনটা মিস করেছে। আর তারপর ঝড় জলে এই অবস্থা। কি হবে সীমাদি?

কত দূরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে ? ধ্রুব জিজ্ঞাসা করলো।

ইরা জানালো এখান থেকে তিনটে স্টেশন আগে।

ধ্রুব  –  মেইন রোড ধরে গেলে কতক্ষন?

পৌনে একঘন্টা লাগবে। উত্তর এলো ইরার কাছ থেকে।

ওকে, একটা বাইক বা গাড়ি কিছু পাওয়া যাবে ? কেননা বাস এখন চলবে বলে মনে হয় না।

না বাস চলবে না। তবে বাইক আছে।বাবার বাইকটা আছে তো। তুমি যাবে ধ্রুবদা ? জিজ্ঞাসা করলো ইরা।

ধ্রুব বললো – হুম যাবো। এরপর জিজ্ঞাসা করলো নীরা ঠিক আছে তো?

ইরা – ঠিক থাকবে না কেন? এক ট্রেন লোক আছে। অন্য ভয় নেই। তবে সারা রাত যদি থাকতে হয় সেটাই ভয়। তবে অনেকবার ফোন করে কাটা কাটা শোনা গেছে যে দিদি ঠিক আছে। ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে স্টেশনেই। তারপর থেকে আর ফোন পাওয়া যায়নি

সাবধানে যাস ভাই – বললো সীমা। ইরার সাথেই ধ্রুব নীরাদের বাড়িতে এলো। নীরার মাও অপেক্ষা করছিলেন মেয়ের জন্য। কি খবর নিয়ে আসে। ধ্রুব যাবে শুনে বললেন তুমি অনেক বড় হও বাবা। ভালো থাকো। ইরা গাড়ির চাবিটা ধ্রুবর হাতে তুলে দিলো। বাইকে স্টার্ট দিয়ে ধ্রুব নীরাকে আনতে চললো। ঠিক যেন রাজকুমারী বিপদে পড়েছে তাঁকে বাঁচাতে যাচ্ছে রাজকুমার।

প্রিয় বন্ধু মিডিয়ার খবর আরও সহজে হাতের মুঠোয় পেতে যোগ দিন আমাদের যে কোনও এক্সক্লুসিভ সোশ্যাল মিডিয়া গ্রূপে। ক্লিক করুন এখানে – টেলিগ্রামফেসবুক গ্রূপ, ট্যুইটার, ইউটিউবফেসবুক পেজ

যোগ দিন আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রূপে – ক্লিক করুন এখানে

প্রিয় বন্ধু মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরের নোটিফিকেশন আপনার মোবাইল বা কম্পিউটারের ব্রাউসারে সাথে সাথে পেতে, উপরের পপ-আপে অথবা নীচের বেল আইকনে ক্লিক করে ‘Allow‘ করুন।


আপনার মতামত জানান -

একটু আগেই ভাবছিলো নীরাকে যদি একবার দেখতে পেত। এবার এতটা সময় নীরা তার সাথে থাকবে। একসঙ্গে গাড়িতে করে বাড়ি যাবে। মনটা ফুরফুরে হয়ে গেলো।এটা সেটা কথা ভাবতে ভাবতেই সামনে একটা চায়ের দোকান দেখতে পেলো। সামনের চায়ের দোকানে ধ্রুব জিজ্ঞাসা করলো ইসানপুর স্টেশন কতদূর। আর এসেই গেছে জানালো দোকানদার। বলে দিলো কোথায় যেতে হবে। এর আগেও দু তিনটে চায়ের দোকানে জিজ্ঞাসা করেছে ধ্রুব। একেবারে অচেনা জায়গা। যায় হোক স্টেশন এলো ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। ইরা বলেছিলো নীরা লেডিস কম্পার্টমেন্টে আছে ।বাইকে চাবি দিয়ে যতটা জোরে যাওয়া যায় গেলো ধ্রুব। জানালা দিয়ে ভেতরগুলো দেখতে লাগলো দেখতে পেলো না। পাগলের মতো খুঁজছে ধ্রুব নীরাকে। কোথাও নেই। হঠাৎ সামনের ২ টো জানালার দিকে চোখ পড়তেই একটাতে সেই চেনা মুখ দেখতে পেলো ধ্রুব। বসে পড়লো প্লাটফর্মের একটা  বাঁধানো গাছের তলায় । নীরা জানালা দিয়ে প্লাটফর্মটা দেখছে। কিছু ভাবছে। কে যাচ্ছে ,কে আসছে কোনো খেয়াল নেই। নীরাকে খুব মিষ্টি লাগছে একটা ক্লান্তিপূর্ণ মুখ। মনে হচ্ছে একটা নিশ্চিন্ত কাঁধ পেলেই ঘুমিয়ে যাবে। উঠতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু নাঃ আর বসলে হবে না , নীরাকে নিয়ে সাবধানে বাড়ি ফিরতে হবে।

 

উঠে জানালার সামনে গেলো ধ্রুব। নীরা চোখ তুলেই চমকে গেলো। বললো আপনি?

ধ্রুব বললো ইরা ফোন করে নি।

নীরা জানালো করেছিল কিন্তু কিছু শোনা যায়নি। তারপর থেকে টাওয়ার নেই।

ধ্রুব বলল  সেই এসেছে নীরাকে নিয়ে যেতে।

ট্রেন থেকে নেমে ধ্রুবর কাছে এলো নীরা। দুজনে একসঙ্গে হাটতে লাগলো। যেখানে বাইক রেখেছিলো সেখানে এলো। বাইক স্টার্ট করলো ধ্রুব , নীরা কিন্তু কিন্তু করে ধ্রুবর কাঁধে হাত দিয়ে বাইকের পিছনে বসলো। ধ্রুবর গায়ে নীরা হাত রাখতেই বাইকের হ্যান্ডেল জোরে চেপে ধরলো ধ্রুব। একটা অন্যরকম ভালোলাগা। আজ পর্যন্ত অনেক মেয়ের সাথে হাত মিলিয়েছে। তার কাঁধে হাত দিয়ে অনেক মেয়ে বাইকে চেপেছে কিন্তু এই অনুভূতিটা হয়নি কোনোদিন।

হয়েছে? স্টার্ট করি এবার? নিজেকে সামলে নীরাকে জিজ্ঞাসা করলো ধ্রুব।

নীরা আস্তে উত্তর দিলো – হ্যাঁ।

বাইকে স্টার্ট দিতেই ফের নীরা ধ্রুবর কাঁধে হাত রাখলো। গোটা শরীরে ছুঁয়ে যাচ্ছে অনুভূতিটা। ধ্রুব ভাবলো যদি এইভাবেই চলতো। যদি রাতটা না শেষ হতো ভাবতে ভাবতেই গাড়ি ছুটলো।

 

নীরা এমন অনেকবার কলেজ , ইউনিভার্সিটি থেকে আসতে আসতে আটকে পড়েছে। বাবা, পাড়ার পল্টু দা, প্রবীরদা, এরা এসে নিয়ে গেছে। আজকে নীরা তাই ভয় পায়নি। কিন্তু খুব ক্লান্ত লাগছে। ঘুম পাচ্ছে খুব। সেই সকালে বেরিয়েছে। স্যার এর কাজ আছে বলে বসিয়ে রেখে দুপুরে নোট দিলেন। তারপর ট্রেন মিস তারপর এই কান্ড। কিন্তু প্রকাশদা,প্রবীরদা ,বাবা এরা কেউ কেন এলো না? বাবার কিছু হয়নি তো? সব ঠিক আছে তো বুকটা ধক করে উঠলো। ইরা বাবা বলে কিছু একটা বলেছিলো ফোনে কাটা কাটা শব্দ আসছিলো স্পষ্ট কিছু শোনা যায়নি।  বছরখানেক আগে এমন একবার নীরা ট্রেনে ফেঁসেছিলো , বাবার বাইক নিয়ে প্রবীরদা আনতে এসেছিলো কিছু বলেনি রাস্তায় নীরাকে। বাড়ি গিয়ে দেখেছিলো বাবা মাথা ঘুরে পরে গেছে। প্রেসারটা বেড়েছে। ডাক্তার বলেছে মাইল্ড স্ট্রোক। যে কারণেই ওর মা নীরার বিয়ে নিয়ে এত মাতামাতি করছে। হঠাৎ  যদি কিছু হয়ে যায় সোমেস্বরবাবুর মেয়েদের নিয়ে কি করবেন। আজ ও কি তেমন কিছু ? নাহলে বাবা না এলেও প্রবীরদা, প্রকাশদা কেন এলোনা। শুনছেন ? নীরা আবার বললো – শুনছেন ?

 

ধ্রুব এখন অন্য জগতে। ভীষণ ভালো লাগছে ধ্রুবর। বাইক আস্তেই চালাচ্ছে বাড়ি যাবার ভীষণ তাড়া নেই। ধ্রুব জানে এই সুন্দর মুহূর্তটা আর কোনোদিন আসবে না তার জীবনে। বাড়ি পৌঁছে গেলেই সব শেষ। শুধু মিষ্টি স্মৃতিটা ছাড়া আর কিছুই থাকবেনা। যে আজ তার কাঁধ ছুঁয়ে বসে আছে সেও আর থাকবে না কদিন পরেই অন্য কারুর হয়ে যাবে। ধ্রুবর জায়গায় অবিনাশ থাকবে। নীরা অবিনাশের কাঁধে হাত রাখবে , কিংবা জড়িয়ে ধরবে। সেটাই তো স্বাভাবিক। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে  হাসলো ধ্রুব । হঠাৎ কাঁধে টোকা পড়লো।

একটা উদ্বিগ্ন গলার স্বর শুনলো ধ্রুব – শুনছেন?

ধ্রুব বললো – হ্যাঁ কি? বলছি আপনি কেন আনতে এলেন? বাবা কেন এলোনা। প্রকাশদা ও তো আসতে পারতো এলোনা কেন? সব ঠিক আছে তো?

ধ্রুব উত্তর দিলো মেসোমশাই নেই ?

মানে ? বলে চিৎকার করে উঠলো নীরা। কি হয়েছে বাবার ? বাবা কোথায়? কিছু লুকোবেন না প্লিজ ? বলে জোরে কাঁদতে লাগলো। ধ্রুব চমকে গেলো। এই পরিস্থিতির জন্য তৈরী ছিল না একেবারেই। গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিলো। নীরা নেমে পড়লো বাইক থেকে। ধ্রুব গাড়ি থেকে নেমে মাথা থেকে হেলমেট খুলে দেখলো দু চোখ ভর্তি জল, কেঁদেই যাচ্ছে নীরা। দুই চোখে একরাশ জিজ্ঞাসা ধ্রুবকে।

ধ্রুব বললো রিলাক্স , মেসোমশাই ঠিক আছেন ?

কিছু শুনবে না নীরা। আপনি মিথ্যা বলছেন। বাবা আর নেই, সব শেষ হয়ে গেছে বলে আচমকা ধ্রুবকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলো। ধ্রুবর যেটুকু সর্বনাশ হওয়া বাকি ছিল এবার সেটুকুও করে দিলো নীরা। হাত দুটো শক্ত করে মুঠো করে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো ধ্রুব।এই অবস্থায় কি করা উচিত ধ্রুবর ? নীরাকে জড়িয়ে ধরবে ? নাকি ছাড়িয়ে দেবে ? যেমন দাঁড়িয়েছিল তেমনি দাঁড়িয়ে রইলো নীরা হাউ হাউ করে কাঁদতেই থাকলো।

 

গল্পের আগের অংশ  –  বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ৫

 

 

পরের অংশও   – বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ৭

 

আপনার মতামত জানান -
Top
error: Content is protected !!