এখন পড়ছেন
হোম > অন্যান্য > বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ১

বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ১



নীরার বাড়িতে এখন সাজো সাজো রব। সামনেই নীরার বিয়ে। বাবা-মায়ের কত চিন্তাই না ছিল কালো মেয়ের বিয়ে দেবেন কি করে! অবশ্য বাবার কথাটা ভুল, বলা ভালো মায়ের আর আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীর। কিন্তু সব চিন্তা ছাপিয়ে, আতত্মীয়স্বজনকে ও পাড়াপ্রতিবেশীর বুকে রীতিমতো জ্বালা ধরিয়ে রাজপুত্রের মতন জামাই করছেন নীরার মা । গর্বে মাটিতে পা পড়ছে না – এমনটা না হলেও বেশ দেখনদার ভাব তো রয়েছেই। পাড়ার কাকিমা জেঠিমা , পিসি মাসিদের কাছে নীরার মা প্রায়ই বলছেন এমন ছেলে যা হোক কিছু  তো দিতে পারি না,এই দামি জামা, ওই দামি জুতো , ওই ঘড়ি , এই সোনার হার দিয়ে আশীর্বাদ করবো, নমস্কারিতে এই শাড়ী ,ওই শাড়ী, এমন হাজার ফিরিস্তি। নীরার বাবা , নীরা, ইরা বিরক্ত হচ্ছেন কিন্তু মানা করলেও শুনছে কে? অগত্য তারাও এখন চুপ।

চন্দন পুরের হাই স্কুলের বাংলার শিক্ষক সোমেশ্বর বাবুর দুই মেয়ে নীরা আর ইরা। নীরা বড়, ইরা ছোট-সাধারণ বাড়ির সাধারণ মেয়ে বলতে যা বোঝায় নীরা বরাবরই সেরকম। একটু চাপা স্বভাবের, শান্ত। কিন্তু বড় বড় চোখ দুটো যেন না বলতে পারা সব কথা বলে দেয়। নীরার গায়ের রং কালো যা নিয়েই এতদিন পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনদের রাতের ঘুম উড়েছিল।নীরার মুখশ্রী খুব মিষ্টি লাবণ্য ভরা একটা মুখ। মুখের দিকে তাকালে কিছুক্ষণ চোখ আটকে থাকবেই। কিন্তু তাতে কি রং যে কালো।

ইরা নীরার বিপরীত, সদ্য কলেজ যাচ্ছে। রীতিমতো ফর্সা, মুখশ্রী নীরার মতো না হলেও খারাপ নয়। মুখ বুজে সব সহ্য করবে এমনটা তো একেবারেই নয়। কিন্তু লেখাপড়ায় মন নেই, যা নিয়ে সোমেস্বর বাবুর বড় চিন্তা। বলতে গেলে বলতে হয় ইরা ওর মায়ের মতো। আর নীরা সে একেবারে বাবার মতন। বাবার মতোই রূপ গুন দুইই পেয়েছে। পড়াশোনা যথেষ্টই ভালো। মেয়ের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ আছে দেখে মেয়ের ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে আর্টস এ ভর্তি করেছিলেন সোমেস্বরবাবু। কিন্তু এতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন সোমেস্বর বাবুর স্ত্রী অতসী। তার ইচ্ছা ছিল মেয়ে যখন পড়াশোনায় ভালো তখন সাইন্স নিয়ে পড়ুক। সে যাইহোক সমস্যার বাবু স্ত্রীর কথায় কর্ণপাত না করে মেয়ের ইচ্ছানুযায়ী মেয়েকে বাংলা নিয়ে বিএ – এমএ দুই পড়ালেন। খুব ভালোভাবে পাস করলো নীরা।

এম এ পাশ করার পর যখন সবাই মীরার বিয়ের কথা তুলতে লাগলো সোমেস্বর বাবু ঘোষণা করলেন মেয়ের ইচ্ছা সে পিএইচডি করবে, আর তারপর চাকরি করবে,তাই মেয়েকে তিনি এখনো পড়াবেন ,চাকরি করাবেন এখন কোনো মতেই বিয়ে হবে না।  আর এতেই তীব্র আপত্তি তুললেন অতসী দেবী। অবশ্য তাকেও খুব একটা দোষ দেওয়া যায়না। কেননা আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, মাসি,পিসি ইতিমধ্যেই তাঁর মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। আর এই খবর চাওয়ার হতেই ঘুম ছুটলো সবার। ও বাবা গো -তার থেকে মেয়েটাকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দাও। এখনো পড়বে তারপর চাকরি করবে তারপর বিয়ে। আর বিয়ে হবে ওর ?  উপদেশ আরো জোরালো হতে শুরু হলো। -পরপর দুটো মেয়ে। বড় মেয়ে যার রং কালো যতই মুখশ্রীর সুন্দর হোক।

এই মেয়েকে পার করতেই অনেক কাঠ খড় পড়াতে হবে। কেননা কালো মেয়েকে কেউ ঘরে তুলতে চায় না সুতরাং বয়স অল্প থাকতে থাকতে যতদিন লাবণ্য আছে তার মধ্যে মেয়েকে পার করে দেওয়া উচিত। মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি। আর যতদিন বড়টার বিয়ে না হবে ততদিন তো ছোটোটাও পার হবে না। সব মিলিয়ে কালো মেয়ে বড় জ্বালা। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি পারো বিদেয় করো। সাথে অবশ্য যোগ করলেন – তবে তোমাদের মেয়ে যা ভালো ভালো বোঝো তাই করো। আমরা তোমাদের ভালো চাই তাই বলছি আর কি।


WhatsApp-এ প্রিয় বন্ধু মিডিয়ার খবর পেতে – ক্লিক করুন এখানে

আমাদের অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া গ্রূপের লিঙ্ক – টেলিগ্রামফেসবুক গ্রূপ, ট্যুইটার, ইউটিউব, ফেসবুক পেজ

আমাদের Subscribe করতে নীচের বেল আইকনে ক্লিক করে ‘Allow‘ করুন।

এবার থেকে আমাদের খবর পড়ুন DailyHunt-এও। এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ও ‘Follow‘ করুন।



আপনার মতামত জানান -

আর এইসব নিয়ে নাছোড়বান্দা অতসী দেবী সোমেস্বরবাবুকে প্রায় চাপ দিতে থাকলেন মেয়ে-যেমন প্রস্তুতি নিচ্ছে নিক এদিকে দেখাশোনা শুরু করা হোক। সোমেস্বরবাবু না করে দিলেন। অতসী দেবী নিজেই পাত্র খুঁজতে মাঠে নামলেন। যারা তাঁকে বিনামূল্যে এতদিন নানা উপদেশ দিতেন, দিচ্ছেন, বললে এখুনি দশ বিশ খানা পাত্র হাজির করে দেবেন তাদেরকে ধরলেন পাত্র খুঁজতে। শুধু ধরলেন না আবদার করে বসলেন। এতদিন বোসগিন্নি যে তাঁর ভাইপোর কথা বলেছেন-ভালো চাকরি করে , বেশ অবস্থাপন্ন ঘর তার সঙ্গে নীরার বিয়ের কথা পারলেন। বোস গিন্নি এতদিন আমার ভাইয়েরা এই, ওই সেই।তাদের ছেলে মেয়েরা আবার আরো এই, ওই। এখনো বোসগিন্নির ভাইয়েরা তাঁর কথা শোনেন। তাঁর নানা উপদেশ মানেন। এখনো বাপের বাড়িতে তিনি যা বলবেন তাই হবে। এমন আরো কত কি গল্প শুনিয়েছেন। ফলে বোসগিন্নি যদি সমন্ধ করেন তো বিয়ে হবেই।

এদিকে বোস গিন্নির অবস্থা হাঁসফাঁস। এতদিন অনেক গল্প শুনিয়েছেন। কিন্তু তারসবটা মিথ্যা না হলেও সবটাই যে সত্যি তেমন নয়। তাকে ভাইয়েরা মাননি করলেও তাঁর কথাতেই সব হবে এমন কোনো কিছুই নয়। বোস গিন্নি দেখছি বলে তখনকার মতো বাঁচলেন। বার বার তাগাদা পেয়ে কদিন পরে জানালেন আসলে ভাইপো রাজি হচ্ছে না , বলেছে কালো মেয়ে, তাকে নিয়ে কি করে বড় বড় পার্টিতে যাবে। সাথেই বললেন – আমিও ভেবে দেখলাম ঠিক কথা তাই জোর করলাম না। জোর করলে হয়তো হতো। কিন্তু ছেলেটা কি দোষ করলো বলো। তবে তুমি চিন্তা করো না অতসী। আমি অন্য ছেলে দেখছি। মুখ কালো করে অতসীদেবী বাড়ি এলেন।

কয়েকদিন চুপ করে থেকে এবার ফের ধরলেন পাল কাকিমাকে। তাঁর ও কে রয়েছে দূর সম্পর্কের। সেখানেও না হলো। কারণ মেয়ের রং কালো। এরপর একে একে যাদের হাতে এতদিন এত পাত্র ছিল তাদের কেমন যেন হটাৎ করে হাত খালি হয়ে গেলো। কেউ বললো সে নিজে দেখে বিয়ে করবে, কেউ বললো পাত্র বিদেশ যাবে অনেক সুন্দরী মেয়ের বাবা লাইন দিয়ে আছে , কেউ বললো এই যাহ এতদিন বললে না বিয়ে হয়ে গেলো গো। নাহলে কালো হলেও আমাদের আপত্তি ছিল না। নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি, মুখ বকাবকি শুরু হলো, মোদ্দা কথা একটাই – মরণ – সখ কম নয়, আমাদের সোনার টুকরো ছেলেদের জন্য এমন কয়লার মতো কালো মেয়েকে ঘরে তুলবো। বলে কোন মুখে কে জানে।অতসীদেবীর মনে হলো তাঁর চারপাশটা বেজায় খালি হয়ে গেছে । কেউ নেই ভরা সংসারে তাঁকে উদ্ধার করার জন্য।

আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও শুরু হলো খোঁজাখুঁজি। বড় ননদের ছেলের সালা, মেজো ননদের ভাগ্না, ছোট ননদের ননদের দেওর। এদিকে বাপের বাড়ির দিকেও। পাত্র জুটলো না। সব ক্ষেত্রে যে রং কালো তা নয়। বড় ননদের ছেলের সালা – এখুনি বিয়ে করবে না। আর তাছাড়া মিন্টু (বড় ননদের ছেলে) খানিকটা মামার মতো। বোনের এখুনি বিয়ে দেবার দরকার নেই। মেজো ননদের ভাগ্না – অবশ্য কালো মেয়ে চলবে না জানিয়েছে। কেননা তাকে দেখতে রাজপুত্রের মতো। ছোট ননদের ননদের দেওর – সে নিজে দেখে রেখেছে। উফফ কোথায় যে এই কষ্ট রাখবেন অতসীদেবী। মাথা খুঁড়ে মরতে ইচ্ছা করছে। এমন মেয়ে জন্ম দিয়েছেন। আর ওই লোকটা ভগবান – এমন লোক যে নিজের মেয়েদের কথা ভাবে না। কোথায় এনে ফেলেছো আমায়- দিনরাত এই করে চলছেন। মেয়ের আর বিয়েই হবে না।

বাড়িতে শুরু হলো অশান্তি। বার বার বুঝিয়েও কোনো কাজ হলো না। ইরার সঙ্গে মায়ের ঝগড়া বাঁধতে থাকলো রোজ। নীরা মুখে কিছু না বললেও লুকিয়ে চোখের জল ফেলতে লাগলো। এদিকে বাড়িতে অশান্তি বাড়তে লাগলো। সোমেস্বরবাবুর এ হেনো মেয়ের বিয়ের প্রতি অবহেলাকে সহ্য করতে পারছিলেন না অতসীদেবী। নীরাকে যা খুশি বলতে শুরু করলেন। বাড়িতে রোজই মনোমালিন্য, অশান্তি। গিন্নির মেজাজ সপ্তমে চড়ে আছে। অগত্যা সোমেস্বরবাবু পাত্র খুঁজতে শুরু করলেন।

 

 

পরের পর্ব – বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা – কলমে – অপরাজিতা – পর্ব ২

আপনার মতামত জানান -

Top
error: Content is protected !!